বিজ্ঞাপন

রাস্তার ভবঘুরেদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত রাখছেন সৈকত সরকার

নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত উপজেলা দুর্গাপুর। এ জনপদে মুমূর্ষু রোগী, অসহায়, ছিন্নমূল ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের কাছে এখন ভরসার এক নাম সৈকত সরকার। নিজের আরাম-আয়েশ তুচ্ছ করে গত আট বছর ধরে তিনি নীরবে করে যাচ্ছেন একের পর এক মানবিক কাজ। কখনও মুমূর্ষু রোগীর জন্য খুঁজছেন রক্ত, কখনও কনকনে শীতে ফুটপাতে পড়ে থাকা মানুষের গায়ে জড়িয়ে দিচ্ছেন কম্বল, আবার কখনও বুক সমান বন্যায় মাথায় করে পৌঁছে দিচ্ছেন খাবার।

সৈকত সরকারের বাবার নাম মৃত মো. নুরুল ইসলাম। তার বাবা উপজেলা ভূমি অফিসে কেরানি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বিধবা মায়ের নাম মোছা. শাফিকুন নাহার এবং তারা তিন ভাই এবং তাদের কোনো বোন নেই। তিনি ভাইদের মধ্যে সবার ছোট। তার বড় ভাই বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি করেন এবং মেজ ভাই চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন। সৈকত সম্প্রতি মাস্টার্স শেষ করেছেন। তার আয়ের প্রধান উৎস ওষুধের দোকান। দুর্গাপুর হাসপাতাল গেটে অবস্থিত তার ফার্মেসীর নাম ‘এসবি মেডিকেল হল’।

সৈকত সরকারের মানবিক যাত্রার শুরুটা আট বছর আগে। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় এবং পরে ঢাকা তিতুমির কলেজ থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার সময়ে তিনি কাছ থেকে দেখেছেন রক্তের জন্য মানুষের হাহাকার। সেই উপলব্ধি থেকেই ২০১৮ সালে নিজের প্রত্যন্ত এলাকা দুর্গাপুরে তিনি গড়ে তোলেন মানবিক সংগঠন ‘এসবি রক্তদান সমাজকল্যাণ ফাউন্ডেশন’।

দুর্গাপুরের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় সৈকত ও তার সহযোদ্ধারা মিলে গত আট বছরে প্রায় তিন হাজার ৩০০ ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করেছেন। এরমধ্যে দুর্গাপুরের ১৩ জন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনবার নিয়মিত রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে সৈকতের এমন উদ্যোগ।

করোনার ভয়াবহ দিনগুলোতে সৈকত বিনামূল্যে মানুষের দ্বারে দ্বারে অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দিয়েছেন এবং সেবা দিতে গিয়ে তিনি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। রাস্তায় পড়ে থাকা নোংরা, অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের নিজ হাতে পরিষ্কার করা, গোসল করানো এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাদের চিকিৎসা ও আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানোর কাজটি তিনি পরম মমতায় করেছেন ও করে যাচ্ছেন। শীতের রাতে তিনি ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষদের গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেন। বন্যায় বুক সমান ঘোলা পানিতে নেমে অসহায়দের হাতে শুকনো খাবার তুলে দেন এবং কামারখালী নদীর বাঁধ ভেঙে গেলে তরুণদের সাথে নিয়ে সেই বাঁধ মেরামতেও হাত লাগান।

যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে দুর্গাপুর উপজেলার প্রায় ৪৮টি স্কুলে তিনি ঘুরে ঘুরে মাদকমুক্ত সেমিনার করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন মাদকের বিরুদ্ধে ‘লাল কার্ড’। সেই সাথে বাল্যবিবাহ রোধ, পরিবেশ রক্ষায় অধিকাংশ স্কুলে বৃক্ষরোপণ এবং যুবকদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করতেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে তার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এসব মহৎ উদ্যোগ প্রমাণ বহন করে তিনি কতটা পরিবেশ প্রেমী।

সৈকতের মনে একটি অপূর্ণ স্বপ্ন রয়ে গেছে। রাস্তায় পড়ে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন ও ছিন্নমূল মানুষদের জন্য তিনি দুর্গাপুরে একটি আশ্রম গড়তে চান, যেখানে এসব মানুষগুলো একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে এবং তিনি নিজের হাতে তাদের সেবা করতে পারবেন।

সময়ের সাথে সাথে সমাজের কাছে যখন অনেক প্রশ্ন জাগে, তখন সৈকত সরকারের মতো তরুণেরাই প্রমাণ করেন- ‘মানুষ মানুষের জন্য’। নিজের সামান্য সামর্থ্য নিয়ে একজন মানুষ চাইলে সমাজের কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে, সৈকত সরকার তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নেত্রকোনা জেলাজুড়ে মহান স্বাধীনতা দিবস পালিত

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন