বিজ্ঞাপন

ঐতিহাসিক মার্কিন-ইরান বৈঠক: বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন

দুই বছর আগেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার পাকিস্তানই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে বিশ্বমঞ্চের প্রধান কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের প্রস্তাবিত দুই সপ্তাহের অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এবার সরাসরি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদ।

বিজ্ঞাপন

শনিবারের ঐতিহাসিক বৈঠকে অংশ নিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কোণঠাসা থাকার পর পাকিস্তানের এই সফল মধ্যস্থতাকে দেশটির বড় ধরনের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের যে গুরুত্ব কমে গিয়েছিল, এই মধ্যস্থতার মাধ্যমে দেশটি আবার তার হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। পাকিস্তানের একটি জাতীয় দৈনিক এই সাফল্যকে উদ্‌যাপন করে শিরোনাম করেছে, ‘পাকিস্তান পুরো একটি সভ্যতাকে রক্ষা করেছে’।

জানা গেছে, পাকিস্তানের এই শান্তি প্রচেষ্টার মূল কারিগর দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। তিনি গত এক বছরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করার পাশাপাশি ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।

তবে এই প্রক্রিয়ায় টার্নিং পয়েন্ট ছিল চীনের সরাসরি হস্তক্ষেপ। পাকিস্তান চীনকে রাজি করিয়ে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাতে তারা এই অস্ত্রবিরতি মেনে নেয়। বিনিময়ে বেইজিং ইরানি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এই শান্তি প্রক্রিয়ায় চীনের গঠনমূলক ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন।

ঐতিহাসিক বৈঠক কখন-কোথায়?

হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, পাকিস্তানের স্থানীয় সময় শনিবার সকাল থেকেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, এই আলোচনা প্রক্রিয়া আগামী ১৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর ফলে প্রতিনিধিদলগুলো দীর্ঘ সময় ইসলামাবাদে অবস্থান করবে অথবা একাধিক দফায় আলোচনায় অংশ নেবে।

ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেল এই বৈঠকের ভেন্যু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও দূতাবাসসমৃদ্ধ ‘রেড জোন’-এ অবস্থিত এই হোটেলটি বুধবার সন্ধ্যা থেকেই সাধারণের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হোটেলের সব অতিথিকে কক্ষ খালি করার নির্দেশ দিয়ে পুরো ভবনটি প্রতিনিধিদলের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৯ ও ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। রেড জোন এলাকা সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হয়েছে এবং শহরের প্রধান প্রবেশপথগুলোতে সেনাবাহিনী ও বিশেষ পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নেবেন যারা

মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার।

অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা তাদের প্রস্তাবিত ‘১০ দফা’ দাবির ভিত্তিতে এই আলোচনায় অংশ নেবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ শুক্রবার রাত অথবা শনিবার সকালে দুই পক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে প্রাথমিক বৈঠক করার কথা রয়েছে। মূল আলোচনার সমন্বয় করবেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার, যিনি এই সংকটের শুরু থেকেই কাজ করছেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরাসরি অংশ নেবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

মার্কিন প্রতিনিধিদলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের উপস্থিতি এই আলোচনার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে জেনেভা ও মাস্কাটে স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করায় তাদের ওপর তেহরানের অনাস্থা রয়েছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, জেডি ভ্যান্স মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বিরোধী এবং তিনি এই যুদ্ধ বন্ধে বেশি আন্তরিক হতে পারেন।

ঐতিহাসিক এই বৈঠকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতোমধ্যে ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন বিশেষ নিরাপত্তা দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। পুরো রেড জোন এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

এদিকে, এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী কাভার করার জন্য কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আবেদন করেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ২০টি বিদেশি গণমাধ্যমকে বৈঠকটি কভার করার অনুমতি দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত জেডি ভ্যান্সের জন্য এই আলোচনা একটি বড় পরীক্ষা।

বৈঠক কেন পাকিস্তানে?

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসলামাবাদ। উভয় দেশের সঙ্গে অতীতে উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমানে দুই পক্ষের সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখছে পাকিস্তান।

সাম্প্রতিক সময়ে নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন ও ইরানি নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে এবং প্রতিবেশী ইরানের পর পাকিস্তানেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনসংখ্যা বসবাস করে। এসব বিষয় তেহরানের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই, যা ইরানের কাছে দেশটিকে বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। একইসঙ্গে ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের একটি মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই হিসেবে স্বীকৃত।

তবুও ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদটি প্রায়শই শূন্য থাকে। ২০১৮ সালের পর মাত্র একজন রাষ্ট্রদূত—ডোনাল্ড ব্লোম—২০২২ থেকে ২০২৫ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে দেশটিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদে কেউ নেই। ২০০৬ সালের মার্চে জর্জ ডব্লিউ বুশ ছিলেন শেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি পাকিস্তান সফর করেছিলেন।

আর শেষ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে সফর করেছিলেন জো বাইডেন। ১৫ বছর পর জেডি ভ্যান্সের এই প্রত্যাশিত সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চেয়ে যুদ্ধ অবসানের আলোচনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ইসলামাবাদে মার্কিন সম্পৃক্ততার একটি বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। কোনো দেশে রাষ্ট্রদূত না থাকা সত্ত্বেও ভাইস প্রেসিডেন্টের সফর একটি বিরল ঘটনা।

আলোচনার টেবিলে কী আছে?

উভয় পক্ষই বড় ধরনের মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনায় বসছে। ইরানের ১০ দফার শান্তি প্রস্তাবে অন্যান্য দাবির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তদারকি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুদ্ধবাহিনী প্রত্যাহার এবং মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই শর্তগুলো গ্রহণ না করলেও ট্রাম্প ১০ দফার এই পরিকল্পনাকে ‘কার্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক—যাকে মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট একটি অগ্রহণযোগ্য দাবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরান এখন পর্যন্ত (অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে) ইউরেনিয়াম ত্যাগের বিষয়ে সম্মতি জানায়নি।

এ ছাড়া অন্যতম বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে লেবানন। বুধবার উত্তর লেবাননে ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ, যেখানে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান অস্ত্রবিরতি ত্যাগ করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্রবিরতি অথবা ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে।’ তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরীফের দাবিকে সমর্থন করে বলেন, ‘অস্ত্রবিরতির মধ্যে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের হামলা বন্ধ অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ তবে বুদাপেস্টে দেওয়া বক্তব্যে জেডি ভ্যান্স বলেছেন যে অস্ত্রবিরতির শর্তে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।

এদিকে, চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ আলজাজিরাকে বলেন, ‘আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই পরিবেশ বিষিয়ে উঠেছে। ইসরায়েল আলোচনা প্রক্রিয়া নস্যাৎ করতে “স্পয়লার” হিসেবে কাজ করছে। লেবাননে তাদের নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণের উদ্দেশ্য হলো এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে উভয়পক্ষ তাদের অবস্থানে স্থির না থাকতে পারে এবং যুদ্ধবিরতিও ব্যর্থ হয়। এই পর্যায়ে আমরা কেবল সতর্কভাবে আশাবাদী হতে পারি, কারণ আলোচনা নিশ্চিতভাবেই জটিল হবে এবং ১৫ দিনের সময়সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।’

ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক সাহার খানও একমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আস্থার অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা। এই মুহূর্তে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই দাবি করছে যে তারা “বিজয়ী”। যদি এই অস্ত্রবিরতি টিকে থাকে এবং তারা সত্যিই আলোচনায় বসে, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’

পড়ুন:

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন