জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ তিন দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনশনরত শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। অনশনের ৫৭ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর অসুস্থ শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে শুক্রবার (আজ) রাতে সেখানে ছুটে যান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাত ১০টা ৪০ মিনিটে উপাচার্য রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে অনশনরত তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা, প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দিন আহমেদসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে– জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে উত্থাপন।
অনশনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে উপাচার্য বলেন, “আমি এখানে তোমাদের অভিভাবক হিসেবে এসেছি, সরকারের কেউ হিসেবে নয়। তোমাদের এই মেসেজগুলো আমি সরকারের কাছে পৌঁছে দেব। তবে আমি আবারও বলছি, এটি একটি রাজনৈতিক ইস্যু এবং এর ফয়সালা সংসদে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে নয়। আমার শিক্ষার্থীরা অসুস্থ থাকুক, সেটা আমি চাই না। তাই আমি তাদের দেখভাল করতে এসেছি এবং গতকাল ডাক্তারও পাঠিয়েছিলাম। আমি আশা করি, আমার শিক্ষার্থীরা অনশন ভেঙে আমার সঙ্গে বাসায় ফিরে যাবে।”
এ সময় অনশনকারীদের পক্ষে বক্তব্য দেন শেখ মুস্তাফিজ। তিনি বলেন, “আমি শেখ মুস্তাফিজ। ১৮ জুলাই নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকালে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম। আমাদের জীবনে কোনো কিছুর অভাব ছিল না, এত দীর্ঘ সময় হাসপাতালে কষ্ট করারও দরকার ছিল না। কিন্তু আমরা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনে নেমেছিলাম। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কখনো রাজনৈতিক বিষয়ে এতটা সম্পৃক্ত হয়নি। কিন্তু এবারের জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩৭ জন এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১২ জন শহীদ হয়েছেন। নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলাম।”
উপাচার্যের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় অনশনকারী মো. সাদিক মুনওয়ার মুনেম বলেন, “স্যার, আমি আপনাকে বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ আপনি এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু বলছেন, কিন্তু এটি গণমানুষের দাবি। আমরা এর নিন্দা জানাচ্ছি। এটি মানবাধিকারের ইস্যু। আপনি আপনার নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমাদের সঙ্গে বসে থাকুন এবং সরকারকে জানান, যাতে এগুলো বাস্তবায়ন করা হয়। আপনি চলে যাবেন না।”
অনশনস্থল ত্যাগের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য জানান, তিনি শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙার জন্য অনুরোধ করেছেন এবং তাদের দাবিগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দেবেন।
উপাচার্য চলে যাওয়ার পর মুনেম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা প্রায় ৫৭-৫৮ ঘণ্টা ধরে অনশন করছি। এত সময় পর উপাচার্য মহোদয় ক্যাম্পাসে এলেন। তিনি আমাদের বাবার মতো, কিন্তু এখানে এসে মাত্র দুই-তিন মিনিট অপেক্ষা করে চলে গেলেন। তার আচরণ দেখে মনে হয়েছে, তিনি আমাদের মৃত্যু কামনা করতে এসেছেন। আমাদের দাবির প্রতি তিনি ন্যূনতম শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না; বরং বারবার এটিকে রাজনৈতিক দাবি বলে এড়িয়ে গেছেন।”
প্রসঙ্গত, গত বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে ঢাবির মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য মো. সাদিক মুনওয়ার মুনেম প্রথমে অনশনে বসেন। পরে তার সঙ্গে যোগ দেন ঢাবির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবুর রহমান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইকবাল হোসেন শাহীন।
এদিকে মেডিকেল টিম অনশনকারীদের শারীরিক পরীক্ষা করে জানিয়েছে, তাদের বর্তমান অবস্থা আশঙ্কাজনক। অনশন অব্যাহত থাকলে তাদের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

