বইয়ের পাতায় পড়া বিজ্ঞানের জটিল সব সূত্র আর তত্ত্ব এবার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে! কোষ বিভাজন, মানবদেহের পরিপাকতন্ত্র কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের নানা সূত্র- সবকিছুই শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে ছুঁয়ে ও দেখে শিখছে। বিজ্ঞান শিক্ষাকে আরও জনপ্রিয় এবং আনন্দদায়ক করার লক্ষ্যে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ‘ভ্রাম্যমাণ বিজ্ঞান প্রদর্শনী’।
রবিবার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনী দেখতে শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। অত্যাধুনিক একটি বাসের ভেতর সাজানো হয়েছে বিজ্ঞানের আশ্চর্য জগত।
শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতি দূর করে তাদের বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তোলার এই উদ্যোগে সার্বিক সহযোগিতা করছে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, “বিজ্ঞান মেলা বা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের অংশ হিসেবে আমরা ভ্রাম্যমাণ বাসটিকে নেত্রকোনায় নিয়ে এসেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, শিক্ষার্থীরা যাতে তাদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে। বইতে তারা যা পড়ছে, তা বাস্তবে দেখলে তাদের শেখার ভিত্তি আরও মজবুত হবে। প্রাথমিকভাবে সদর উপজেলায় এই প্রদর্শনী হলেও, পর্যায়ক্রমে জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও এটি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।”
প্রদর্শনীতে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা। তিনি বলেন, “এই প্রদর্শনীটি আমাদের বাচ্চাদের জন্য দারুণ উপকারী। বাসের একপাশে পদার্থবিজ্ঞান এবং অন্যপাশে জীববিজ্ঞানের নানা উপকরণ রাখা আছে। আমাদের সন্তানরা যেন শুধু নেত্রকোনা বা বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তারা যেন নাসায় যেতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আগামী প্রজন্মকে বিজ্ঞানে উন্নত দেখতেই আমাদের এই কর্মসূচি।”
প্রদর্শনীর বাসের ভেতরটা যেন আস্ত একটি বিজ্ঞানাগার। ভ্রাম্যমাণ বিজ্ঞান প্রদর্শনীর দলনেতা এবং বিসিএসআইআর দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মডেল ও যন্ত্রপাতির কাজ বুঝিয়ে দেন। তারা শিক্ষার্থীদের উদ্ভিদ কোষ, প্রাণী কোষ, মাইটোসিস ও মিয়োসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ার মডেল দেখান। এছাড়া মানবদেহের রক্ত সংবহনতন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্র কীভাবে কাজ করে, তা অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন। বাসের ভেতরে থাকা ডিজিটাল স্ক্রিন, মাইক্রোস্কোপ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ডেমোনস্ট্রেশন শিক্ষার্থীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
ভ্রাম্যমান বিজ্ঞান প্রদর্শনীর দলনেতা বিসিএসআইআর এর প্রকৌশলী মো. রবিউল আলম জানান, “উপজেলা পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান শিক্ষাকে ভয় পায় এবং বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে অনাগ্রহী থাকে। শিক্ষার্থীদের এই বিজ্ঞানভীতি দূর করে তাদের বিজ্ঞানমুখী করতেই মূলত আমাদের উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর জন্য আমাদের এই বাসে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রায় শতাধিক এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষণ রাখা হয়েছে।”
দেশব্যাপী তাদের কার্যক্রমের সাফল্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “গত বছর সারা দেশে আমরা প্রায় ৪০০টি স্কুলে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি এবং প্রতিটি জায়গাতেই শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ১৯ ও ২০ এপ্রিল- এই দুই দিন আমরা নেত্রকোনায় এই প্রদর্শনী চালাব। আজ প্রথম দিনেই আমরা প্রায় ছয়শো শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান প্রদর্শনীর সেবা দিতে পেরেছি। আগামী দিনেও নেত্রকোনার বিভিন্ন স্কুল থেকে আসা সকল শিক্ষার্থীকে আমরা এই সেবা প্রদান করব। ”
এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষার্থী জানায়, বইয়ে পড়া বিষয়গুলো বাস্তবে দেখতে পেয়ে তাদের অনেক দিনের কৌতূহল মিটেছে এবং বিজ্ঞানের প্রতি তাদের আগ্রহ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সন্তানদের নিয়ে আসা অভিভাবকরাও এমন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রদর্শনীতে সন্তানকে নিয়ে আসা এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো নিয়ে সবসময় জানতে চায়। তাই তাকে এখানে নিয়ে এসেছি, যেন সে নিজ চোখে এসব দেখতে পারে।”
ই-লার্নিং নিয়ে কাজ করা শিল্পী সরকার নামের আরেক অভিভাবক বলেন, “বাচ্চারা প্র্যাকটিক্যালি দেখতে পারছে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কীভাবে কাজ করে। এমন আয়োজন নিয়মিত হলে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি ভীতি কেটে যাবে এবং তারা নতুন কিছু উদ্ভাবনে আগ্রহী হবে।”
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের এমন শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ এবং বিসিএসআইআর এর ভ্রাম্যমাণ বিজ্ঞান প্রদর্শনী জেলার বিজ্ঞান শিক্ষায় একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পড়ুন : ঝিনাইদহে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চার তলা ভবন থেকে পড়ে রং মিস্ত্রি নিহত


