দেড় বছর ধরে কারাবন্দি সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম। কিন্তু কারাগারে বসেই চিকিৎসা নিয়েছেন সিঙ্গাপুরে। দেখিয়েছেন নিজ সংসদীয় এলাকা কামরাঙ্গীচরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাগজপত্রও। ‘গ্যাসট্রিক ক্যানসারের’ কথা বলে চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলেন বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে। কিন্তু জমা দেওয়া স্বাস্থ্য প্রতিবেদন নিয়ে সন্দেহ জাগায় আপত্তি তোলে প্রসিকিউশন। এ নিয়ে দীর্ঘ শুনানি শেষে আদেশটি বাতিল করে দেন ট্রাইব্যুনাল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কামরুলসহ দু’জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যজন হলেন- ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। আজ (৩০ এপ্রিল) তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, পিজি হাসপাতালের পরিবর্তে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন করেছিল আসামিপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ এপ্রিল একটি আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে আদেশটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে গুরুতর অসংগতি ধরা পড়ে।
তিনি জানান, এভারকেয়ার হাসপাতালে বন্দিদের জন্য কোনো প্রিজন সেল নেই। বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে চিকিৎসা নিতে বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন হয়। এছাড়া চিকিৎসার ব্যয় বহনের বিষয়েও আদেশে কোনো নির্দেশনা ছিল না। এমনকি চলতি বছরের ১২ ও ১৫ ফেব্রুয়ারির দুটি মেডিকেল প্রতিবেদন জমা দেয় আসামিপক্ষ, যা সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছে। কারণ ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কারাগারে রয়েছেন কামরুল ইসলাম। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়া তিনি কীভাবে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে এসব প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, একটি কাগজে ‘গ্যাসট্রিক ক্যানসার’ উল্লেখ রয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এছাড়া প্রতিবেদনটি একটি প্রত্যন্ত এলাকার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসকের নামে দেওয়া। আরেকটি প্রতিবেদন আনা হয়েছে সিঙ্গাপুর থেকে। দুটি প্রতিবেদনই আবেদনের সঙ্গে জমা দিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, রোগীকে না দেখে কিংবা তিনি ডাক্তারের কাছে না গিয়ে কি করে এই চিকিৎসাপত্র ট্রাইব্যুনালে আনলেন। কারণ দুটি কাগজই আমার কাছে এক ধরনের বানানো মনে হয়েছে। অথবা এসব কাগজের যথার্থতা নেই। কারণ ১৫ ফেব্রুয়ারির ডাক্তারি প্রতিবেদনটি কামরুল ইসলামের নির্বাচনী এলাকা কামরাঙ্গীরচরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের। সেখানকার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক চিকিৎসকের প্রতিবেদন।
মূলত এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ট্রাইব্যুনালে আদেশটির পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে প্রসিকিউশন। শুনানি শেষে আদেশটি স্থগিত করে এবং পরবর্তীতে তা বাতিল করেন। একইসঙ্গে মেডিকেল কাগজ কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা জানতে ১৫ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে তার আইনজীবীদের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো ভুয়া বা জাল কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আফতাব মাহমুদ চৌধুরী। প্রসিকিউশনের তোলা জালিয়াতির অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, জমা দেওয়া কাগজপত্র যে সঠিক, তা প্রমাণ করতে আমাদের ১৫ দিনের সময় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এই সময়ে বাংলাদেশ মেডিকেলেই চিকিৎসাধীন থাকবেন কামরুল ইসলাম।
সিঙ্গাপুর থেকে করানো কিছু পরীক্ষার প্রতিবেদন বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে এই আইনজীবী বলেন, নিম্ন আদালতে আমরা একটা আবেদন দিয়েছিলাম যে, কামরুল ইসলামের কিছু চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাংলাদেশে সম্ভব নয়, সেগুলো আমরা নিজ খরচে সিঙ্গাপুর থেকে করিয়ে আনবো। আদালত সেটি মঞ্জুর করে আমাদের আবেদনসহ বাংলাদেশ মেডিকেলে পাঠিয়ে দেয়।
আফতাব জানান, কামরুল ইসলামের শারীরিক পরীক্ষার জন্য কিছু নমুনা সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ মেডিকেলে পাঠান কারা কর্তৃপক্ষ। সেখান থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব নমুনা সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেগুলোর প্রতিবেদন আসে।
প্রসিকিউশনের ‘ভুয়া কাগজপত্রের’ অভিযোগ প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, ‘আজ যে কেস হিস্ট্রিটা দেওয়া হয়েছে, সেটা কোনো মেডিকেল রিপোর্ট নয়; তার (কামরুল) কী কী সমস্যা রয়েছে, সেসবের একটি হিস্ট্রি মাত্র। যেহেতু তিনি জেল কর্তৃপক্ষের অধীনে, তাই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। তার ছেলেও একজন চিকিৎসক। মূলত ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই কেস সামারি দেওয়া হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ডুপ্লিকেট, ম্যানিপুলেট করা বা ফেক (ভুয়া) কাগজ দেওয়ার সুযোগ নেই। সব মেডিকেল সার্টিফিকেটে থাকা চিকিৎসকের বিএমডিসি নম্বর অনলাইনে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। এগুলো সঠিক কি না, তা প্রমাণের জন্যই আদালত আমাদের ১৫ দিন সময় দিয়েছেন।’
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

