ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের মরশুম চলছে। দ্রুত বেগে এগিয়ে চলা জয়রথ শক্ত আসন গেড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। গেরুয়া বসনের আনন্দ উত্তেজনা চলছে রাজপথে। বেদনার বীজও কম নয়। রক্তও ঝরেছে যে। সবশেষ, যশোর রোডের মধ্যমগ্রাম। শুভেন্দু অধিকারীর সহকারীর বুকেই।
টানা পনেরো বছরের চেনা পশ্চিমবঙ্গে এখন অচেনা রঙের আধিক্য। মানুষ তাই চেয়েছে। তিরানব্বই শতাংশ মানুষের অধিকারের সে আয়োজনে জিতেছে আরএসএসের উত্তরসুরীরা। তাসের ঘরের মত খান খান হয়ে গেল মমতার মসনদ।
শিষ্যের কাছেই তিনি হেরেছেন। ভোটের ব্যবধানও কম নয়। তবে মমতা বলেছেন, তাকে লাঞ্ছনা করা হয়েছে। বন্ধ ছিল সিসিটিভিও। ভবানীপুরের মেয়ে মমতাকে নিজের ঘরেই হারিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
সময়ের তালে বিজেপীর গেরুয়া রঙে ছেয়ে যাচ্ছে ভারত। ধর্মনিরপেক্ষতাকে আঁকড়ে ধরা ভারতে বিজেপির উত্থান বোঝবার বিষয়ও বটে।
একজন প্রচারক থেকে আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনিই এই সময়ে বিজেপির তুরুপের তাস। সেই চৌদ্দ সাল থেকে তার শাসনেই চলছে বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক এ রাষ্ট্র। তবে কীভাবে সম্ভব হল ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের ভারতে বিজেপির উত্থান?
স্বাধীনতার পর থেকে ভারত, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি যুক্ত করেনি। পঞ্চাশে কার্যকরের পর নানান সংশোধনীতে বারংবার কাটাছেঁড়া হয়েছে রাষ্ট্রের মূলনীতি।
বিয়াল্লিশতম সংশোধনীতে এসে সংবিধান পেল ধর্মনিরপেক্ষতা। তখন জরুরী অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ছিয়াত্তরের ঐতিহাসিক এক রায় এবং সংশোধনীতে ইন্দিরাগান্ধী মূলত ভারতের মনস্তত্বই ফুটিয়ে তুলেছিলেন সংবিধানে।
সমাজতন্ত্রিক শব্দের পাশাপাশি জায়গা করে নেয় ধর্মনিরপেক্ষতা। বলা যায় ইন্দিরা গান্ধী মূলত প্রাতিষ্ঠানিক রূপই দিলেন। এরপরও এসেছে সংশোধনী। যাতে আরও পোক্ত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। যদিও গল্প তারও আগের।
যে মামলার কথা বলছিলাম, তা তিহাত্তর সালের। কেশবনন্দ ভারতী মামলা। সে রায়েই সর্বোচ্চ আদালত জানিয়েছেন, ধর্মনিরপেক্ষতাই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। চাইলেই তা পরিবর্তন করা যাবে না।
তবে বিজেপি এই ধারণার বিরোধী। তাদের মাতৃসংগঠন আরএসএস এই ভাবনার বিপরীতে। আরএসএস এর জন্মই হিন্দুরাষ্ট্র ভাবনায়। ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে তারা চান ইতিবাচাক ধর্মনিরপেক্ষতা।
যার মূলনীতি “সবার জন্য ন্যায় বিচার, কারো জন্য তোষণ নয়”। এর পেছনে তাদের মনস্তত্বও আগ্রহ জাগানিয়া। তারা বিশ্বাস করে, ভারতীয় সংস্কৃতি মূলত হিন্দু সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। তাদের চাওয়া, রাষ্ট্র এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধীকার বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিক।
আরএসএসএর এমন ধারণা ভারতের শুরু থেকেই। যদিও স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের ভুমিকা নিয়ে নানান প্রশ্ন আছে। তবে এ কথা অমূলক নয় যে, তারা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখেনি। গান্ধীর আহবানে তারা প্রকাশ্য সমর্থন জানায়নি। এমন অভিযোগ কম নয়।
ওদিকে মহাত্মা গান্ধীকে যিনি খুন করলেন। সে নথুরাম গডসে। তার যোগাযোগও তো ছিলো আরএসএস এ। প্রাক্তন এ সদস্য সে।
আটচল্লিশের সে খুন পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞার খড়গ হিসেবে নামে আরএসএস এর সামনে। বিজ্ঞানমনষ্ক ধর্মনিরপেক্ষ জওহরলাল নেহেরু তাই নিষিদ্ধই করেন আরএসএস কে। যদিও রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তারা আবার সুযোগ পান।
ঐতিহাসিক নানান তথ্য উপাত্ত বলে, স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনে আসএসএস নিজেদের সরাসরি জড়ায়নি। উল্টো ব্রিটিশদের সাথে ছিল যোগযোগ।
যদিও আরএসএস দাবী করে, তারা সামনাসামনি না থেকে ভেতরে ভেতরে একত্রিত করেছেন হিন্দুদের। জাতীয়তাবাদে ঐক্যবদ্ধ করেছেন ভেতরে ভেতরে। শতাব্দী পেরিয়েছে আরএসএস এর প্রতিষ্ঠার। পঁচিশে প্রতিষ্ঠার পরও কেটেছে আরও পঁচিশ বছর।
মূলত একান্ন সালে সংগঠনটির প্রথম দিকের প্রচারক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, পরে যিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন, তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জনসংঘ।
যেটি আরএসএস এর রাজনৈতিক শাখা। আরএসএস এর প্রচারক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন জনসংঘে। দীন দয়াল উপাধ্যায় ছিলেন তখন সাধারণ সম্পাদক।
তারপর, পঁচাত্তরের জরুরি অবস্থা। সাতাত্তর অবধি স্থায়ী হওয়া সেই জরুরি সময়েই জনসংঘ ও বাকি বিরোধী জোট মিলে গঠন করে জনতা পার্টি। ক্ষমতায় থাকার সে সময়ে দ্বৈত সদস্যপদ নিয়ে মতবিরোধে ভাঙনের মুখে পড়ে জনতা পার্টি।
এরপরে, আশি সালেই সামনে আসে ভারতীয় জনতা পার্টি। জনসংঘের প্রাক্তন সদস্যরাই ছিলেন নেতৃত্বে। নির্দেশে ছিলো আরএসএস।
এখনো আরএসএস এর প্রভাব কম নয়। শীর্ষ পর্যায় এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারে মন্ত্রীরাও শোনেন আরএসএস এর কথা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীতো দীর্ঘকাল পার করেছেন প্রচারক হয়ে।
শুধু সরকার বা বিজেপি দলে নয়, আরএসএস এর প্রভাব রয়েছে পুরো দেশজুড়ে। নির্বাচনে সেই নেটওয়ার্ক কাজ করে বিজেপির হয়েই। দেশব্যাপী বৃহৎ নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে জনমত তৈরীতে তারা এগিয়ে থাকে।
মূলত আরএসএস হল বিজেপির শেকড়। আরএসএসের ভাবনাই প্রকাশ পায় বিজেপির নেতৃত্বে। তাই তে হিন্দু রাষ্ট্র ভাবনায় জয়রথ চলছে বিজেপির।
যে রথ শেষ এসে পৌঁছেছে পশ্চিমবঙ্গে। তবে তা যে ভোটের হিসেবেই শুধু, সে কথা পুরোটা নির্দ্বিধায় বলার পক্ষে নানান মত আছে। মমতা শিবির বলছে, টেম্পারিং হয়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থা।
ভোটের আগেই এসআইআর মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে আটকে ফেলা হয় ভোটাধিকার থেকে। সেখানেই পিছিয়ে গিয়েছেন মমতা।
পশ্চিমবঙ্গের দিদির অভিযোগ, তাকে হারাতেই কেন্দ্রিয় সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ভোটার যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে এতোটা ত্বরান্বিত করা হয়েছে।
যেখানে এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি যাচাইকরণ, সেখানে কেন এই অধিকারে খড়গ। অনুপ্রবেশকারী অভিযোগে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন তারা।
নানান ভাবে বাস্তুচ্যুত দরিদ্র সংখ্যালঘু মুসলিমরাই যাচাইকরণে আটকে গেছেন। অনেকেই ঠিকানা হারিয়েছেন নদীভাঙনে। নারীদের কেউ আবার হয়তো নাম বদলেছেন বিয়ের পর।
দাপ্তরিক নানান প্রমাণের ঘেরাটোপে আটকে গেছেন তারা। যা প্রভাব ফেলেছে বিজেপি উত্থানে। মমতার বিরুদ্ধে তো অভিযোগ কম নয় গেরুয়া শিবিরের।
মুসলিম তোষণের অভিযোগ বেশ পুরনো। যার বিপরীতে একসময়ের লালের বৃত্তে হাওয়া পেয়েছে গেরুয়া আবির। যার আশঙ্কা আগেই জানিয়েছে সিপিআইএম।
আর জি কর এর ঘটনায় মমতা সরে গেছেন মায়েদের মন থেকে। অভয়ার মা রত্না তাই মন কেড়েছেন। মমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। ন্যায় বিচারের আশায়।
সামাজিক সুরক্ষার খাতে আর মনঃপুত হচ্ছিলো না ভোটারদের মন। শিক্ষকদের দুর্নীতি কিংবা মিড ডে মিল কেলেঙ্কারি। নানান অভিযোগের আঙুলে মমতা বিদ্ধ হয়েছেন।
তবে মমতার অসহায়ত্বের পেছনে বিজেপির অর্থছাড় নীতিও কাজ করেছে। কেন্দ্রে তো তারাই। একুশে সাতাত্তর জায়গায় ফুটেছে পদ্ম। তখনও মোদি সাহেব বলেছিলেন, পদ্ম ফুটবে শ দুয়েক।
তা যেন পূর্ণতা পেল বছর পাঁচ পরে। ফলাফলে উল্টো চিত্র এবার বিজেপি আর তৃণমূলের। তবে ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ মমতা । পদত্যাগ নয়, বহিস্কার হতে চান তিনি।
শনিবারই আসছেন প্রধানমন্ত্রী। এখনো ঠিক হয় নি, কে হবেন বিধানসভা প্রধান। শুভেন্দু অধিকারী আপাতত বিপর্যস্ত। সবে হারিয়েছেন তার বিশ্বস্ত পিএ চন্দ্রনাথ রয়কে। যার উত্তাপে উত্তাল মধ্যগ্রাম থেকে পশ্চিমবঙ্গ।
সেই ধর্মের রথে চড়েই জয়ের আসনে বিজেপি। মমতা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেন নি। কেন্দ্রের সহায়তা, মমতার সহায় হয়নি। উল্টো আচরণের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে।
সংখ্যালঘু মুসলিমদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটছে। দখলের উন্মত্ততায় ভাংচুর হচ্ছে জোড়াফুলের স্থানীয় নানান কার্যালয়।
কোথাও বা উড়ছে নতুন নিশান। বদলে যাচ্ছে রাস্তাঘাটের নামকরণ। ভোটের উৎসব পরবর্তী উন্মত্ততায় গোটা পশ্চিমবঙ্গ। অবশ্য তার উদাহরণ অতীতেও কম নয়।
তোলাবাজির সংস্কৃতিই ডুবিয়েছে তৃণমূলকে। পুরনো বিশ্বস্ত সহচরেরাও দূরে সরেছেন মমতা থেকে। মমতাই চান নি কাছে রাখতে। তাদের অভিযোগ এমনটাই।
তবে বিজেপি তো কর্পোরেটের সাথে যেন চলেছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।আদানি কিংবা আম্বানির শিল্পে বিজেপির আপত্তি নেই। মমতার অনশনে মুখ ঘুরিয়েছে টাটা। শিল্প আর হয়নি নন্দীগ্রামের সেই নয়শো একর জমিতে। যেন মরা শ্মশান।
তবে মমতা ছাড়ছেন না। নির্বাচনের ফলাফলে কারচুপির অভিযোগ তিনি করেছেনই। তার মতে, বিজেপির পরাজয় হয়েছে নৈতিক। রাষ্ট্রপতি যদি বরখাস্ত করেন, তবে রাষ্ট্রপতির শাসনই চলবে সেখানে।
তবে বিজেপির জনপ্রিয়তার পারদে যে উলম্ফন তা নিশ্চয় নতুন পরিচয় তৈরি করবে পশ্চিমবঙ্গের। রঙের পরিবর্তনে সবে শুরু। আগামীর সময়ই বলবে, বিজেপির জয় কীভাবে বদলায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

