মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পার্ট টাইম জবের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ঘরে বসেই আয় করুন। শুরুতে ভুক্তোভোগী পেয়েছিলেন অল্প কিছু লাভ। কয়েকদিনের মধ্যেই সেই লাভের স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। ধাপে ধাপে খোয়াতে হয়েছে লাখ টাকা। আর সেই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়েই রাজধানী ঢাকা থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এক ভয়ংকর সাইবার প্রতারণা চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবির তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ফেসবুকে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হতো। এরপর টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের গোপন গ্রুপে যুক্ত করে “অনলাইন টাস্ক” সম্পন্নের নামে অর্থ বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হতো। শুরুতে অল্প লাভ দেখিয়ে আস্থা অর্জন করলেও পরে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত চক্রটি।
মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, এক নারী ফেসবুকে প্রকাশিত একটি পার্ট-টাইম চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন। পরে তাকে বিভিন্ন টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ আইডির মাধ্যমে “টাস্ক” সম্পন্ন করে লাভের আশ্বাস দেওয়া হয়। প্রথমদিকে সামান্য লাভ পেলেও পরবর্তীতে তাকে বিকাশ, নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলা হয়। গত ১৩ মার্চ থেকে ২৩ মার্চের মধ্যে ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার ৮৬০ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্রটি। পরে কোনো লাভ বা কাজ না পেয়ে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি রাজধানীর কলাবাগান থানায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্তে প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির সাইবার টিম মেহেরপুরের কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পায়। পরে গত ৭ ও ৮ মে মেহেরপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে রোহান আলী ওরফে রাকেশ (২০), মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে অনলাইন জুয়াড়ি ফয়সাল আহমেদ (২৮) এবং সদর উপজেলার কামদেবপুর গ্রামের মোখলেসুর রহমানের ছেলে রনি মিয়া (২৭)-কে।
ডিবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় আসামিদের কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন, কয়েকটি সিমকার্ড এবং প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত নগদ ১৭ হাজার ৪৪০ টাকা জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছে বলেও দাবি তদন্ত কর্মকর্তাদের।
মামলার তদন্তে আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাঈদ মোহাম্মদ হাসান জোহা (৪৩) ও তার স্ত্রী নূরজাহান খাতুন (৩৯)। ডিবির দাবি, তারা ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় অবস্থান করে প্রতারণামূলক অর্থ লেনদেন পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে ঢাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদেরও গ্রেফতার করা হয়।
ডিএমপির মিডিয়া উইং সূত্র জানিয়েছে, এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন আসামির জিজ্ঞাসাবাদ থেকেই রোহান আলী ওরফে রাকেশসহ অন্যদের নাম উঠে আসে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করে মেহেরপুরে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারণা চক্র। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক, টেলিগ্রাম, টিকটক ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে চাকরি, অনলাইন ইনকাম ও বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করত। এরপর মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করত।
এ ঘটনায় শনিবার (৯ মে) গ্রেপ্তার তিন আসামির বিরুদ্ধে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলেও আদালত তাদের ১ দিন করে মোট ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির আরও সদস্য, অর্থ লেনদেনের উৎস এবং আত্মসাৎ করা টাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অনলাইনে পার্ট-টাইম চাকরি, বিনিয়োগ ও দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে মেহেরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, সিমকার্ড ও নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পরে তাদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেন। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পড়ুন- আর কোন স্বৈরাচারী যেন জনগণের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহার করতে না পারে: প্রধানমন্ত্রী


