২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দীর্ঘ অপশাসনের সমাপ্তি ঘটে। তারুণ্যের হাত ধরে নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দেশবাসী। তবে নতুন এই যাত্রায়ও পড়ছে পুরনো কালো থাবা। শুরু হয়েছে মাদকের মতো নানা তরুণ ও যুবসমাজ বিধ্বংসী আগ্রাসন। খোদ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে এমন চিত্র। এরমধ্যে নতুনভাবে মাদকের আস্তানা হিসেবে জাহির হয়ে উঠেছে যাত্রাবাড়ী। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা সংলগ্ন বাজারের পেছনের এলাকা, মধ্যপাড়া কাঁচা বাজারের মুরগির গলি, চন্দনকোঠা, টানপাড়া, বিদ্যুৎ গলি এলাকায় মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। এমনকি নিকটবর্তী গেন্ডারিয়া, ধুপখোলা, জুরাইন থেকেও কিশোর-তরুণরা মাদকের খোঁজে এসব এলাকায় ভিড় জমাচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় এসব এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা। আর মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন গলিতে বিক্রি হয় মাদক। এখানে সবচেয়ে সহজলভ্য ইয়াবা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব মাদকের নিয়ন্ত্রণ করছেন মুশফিকুর রহমান ফাহিম নামে এক তথাকথিত যুবদল নেতা। তার বিরুদ্ধে থানায় রয়েছে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ বেশ কয়েকটি মামলা।
যাত্রাবাড়ী এলাকার মাদকের নতুন গডফাদার হিসেবে দাপিয়ে বেড়ানো ফাহিম এক সময় যাত্রাবাড়ী থানা যুবদলের সহ-সভাপতি ছিল। সময়ের পরিক্রমায় আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারে নামে। আর ৫ আগস্টের পর নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেন। আওয়ামী লীগের সময় মাদকের ব্যবসা পরোক্ষভাবে করলেও এখন সরাসরি স্পট খুলে প্রকাশ্যে ব্যবসা করছে ফাহিম। নিজেকে আবারও যুবদল নেতা পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি ও মাদকের কারবার শুরু করেছে। ইতিমধ্যে দলীয়ভাবেও ফাহিমকে বেশ কয়েকবার শোকজ করা হয় এসব ইস্যুতে। গত বছরের (২০২৫ সাল) ২৩ অক্টোবর যুবদলের পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শোকজ এবং দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তিবলে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে নেয় ফাহিম। মূলত সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর নতুন করে আরও জোরেশোরে মাদকের ব্যবসা শুরু করেছে সে। নিজেকে এখন কেন্দ্রীয় যুবদলের শীর্ষ এক নেতার আশীর্বাদপুষ্ট এবং মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আলোচিত এক নেতার রাইটহ্যান্ড হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ী থানা থেকে লুটপাট হয়েছিল বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই অস্ত্রগুলো এখন মুশফিকুর রহমান ফাহিমের নিয়ন্ত্রণে। এলাকাবাসীর ভাষায়, ফাহিম এখন শুধু চাঁদাবাজ না, সে একটা গ্যাং চালাচ্ছে। স্থানীয় জনগণ জানায়, যুবদলের নাম ভাঙ্গিয়ে ফাহিমের এসব অপকর্মের জন্য বিএনপি এবং দলের অন্যান্য নেতাকর্মী বিব্রত।

এ ছাড়া চাঁদাবাজির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলাও রয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-গত বছর শরীয়তপুর বাস সার্ভিস মালিকদের করা মামলাটি। সেই সময় ঘটনাটি টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। মিডিয়া পরে যায় শোরগোল। পত্র-পত্রিকায় শিরোনাম হয় এই ফাহিমের এই চাঁদাবাজির খবর। তার বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে বেশ কয়েকটি স্থানে মানববন্ধনও হয়। গত বছরের (২০২৫) ২২ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের হয় এই মামলার এজাহার। মামলা নম্বর ৪৮। এই মামলায় ১ নম্বর আসামি হিসেবে সরাসরি নাম রয়েছে মো. মুশফিকুর রহমান ফাহিমের। ফাহিম ও তার বাহিনী শরীয়তপুর সুপার সার্ভিস লিমিটেড পরিবহনের বাসের প্রতিনিধিদের কাছে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় ৯ জুলাই ২০২৫ দোলাইপাড় সিগন্যাল এলাকায় বাসের চালক ও প্রতিনিধিদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এরপর ১২ জুলাই ২০২৫ আবারও শরীয়তপুর থেকে ঢাকাগামী বেশ কয়েকটি বাস ভাঙচুর করে ফাহিম ও তার লোকজন। অথচ এই মামলা দায়েরের পরও ফাহিম এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হননি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি হলো, যাত্রাবাড়ী থানার মাত্র ২০০ গজের মধ্যে ইয়াবাসহ মাদকের ব্যবসা চলছে এবং আবাসিক হোটেলে চলছে অসামাজিক কার্যক্রম। এর নিয়ন্ত্রক হিসেবে ফাহিমের নাম সরাসরি এসেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকার মানুষজন ভয়ে মুখ খুলতে রাজি নন, তবে একাধিক সূত্র একই তথ্য এই প্রতিবেদকের কাছে নিশ্চিত করেছে। ফাহিমের এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেন তার ছোট ভাই, যার পরিচিতি মুরগি সোহেল নামে এবং আরেক ভাই শাহিন। এ ছাড়া মাদক সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে একটি হত্যা (হাবু হত্যা) মামলার আসামি কালা শাকিল।

ফাহিমের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও রয়েছে। তবে আইনের নাগাল তার গায়ে এখনও পৌঁছায়নি। এলাকার মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে একজন হত্যা মামলার আসামি এত প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়? আদালতের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী থানার মামলা নম্বর ১০৯, ১৭ আগস্ট ২০২২, দণ্ডবিধির ৩২৬, ৩০৭, ৩০২ ও ৩৪ ধারায় দায়ের হওয়া মামলায় মুশফিকুর রহমান ফাহিমকে এজাহারনামীয় আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, ফাহিম এলাকায় ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করতেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় স্থানীয় যুব নেতা আবু বকর সিদ্দিক ওরফে হাবুসহ আরও কয়েকজনকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয়। ছুরির আঘাতে ঘটনাস্থলেই হাবুর মৃত্যু হয়। পুলিশ পরিদর্শক মো. রাসেলের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফাহিম একজন পেশাদার অপরাধী এবং চাঁদাবাজিসহ হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
চাঁদা, মাদক এবং হত্যামামলার আসামী হয়ে প্রকাশ্যে যেভাবে ফাহিম ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মাদক সম্রাজ্য বিস্তার করছে তা নিয়ে আতঙ্কিত এলাকাবাসী। দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ঘোষণা দিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স থাকবে এই সরকার। গত ১ মে থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানও চলছে। এলাকাবাসীর আশা দ্রুত ফাহিম নিয়ন্ত্রিত মাদকের স্পটোগুলোতে যেনো অভিযান চালানো হয়।
পড়ুন : http://আলোচনায় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা’, নতুনরা কীভাবে সন্ত্রাসে জড়াচ্ছে?


