বিজ্ঞাপন

খিলক্ষেতবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ: আসছে ডিএনসিসির নতুন ৯৬ নম্বর ওয়ার্ড

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের-ডিএনসিসি’র আওতায় খিলক্ষেত থানাধীন কয়েকটি এলাকা নিয়ে নতুন একটি ওয়ার্ড গঠনের জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা বর্তমানে আছে ১৭ নাম্বার ওয়ার্ডের অধীনে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর বিষয়টি এখন চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে জামতলা টানপাড়া, নিকুঞ্জ, খাপাড়া, খিলক্ষেত নামাপাড়া, কুড়াতলী ও লেকসিটি এলাকা নিয়ে ডিএনসিসির নতুন ৯৬ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের এই প্রশাসনিক সংস্কারের খবরে খিলক্ষেত অঞ্চলের লাখো মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ ও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

​বর্তমান ওয়ার্ড বিভাজনে ভোটার সংখ্যা ও জনসংখ্যার চরম ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি তুলে ধরে এলাকাবাসীর পক্ষে মো. শাহীনুর আলম মারফতের মাধ্যমে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।

আদালতের এই কঠোর নির্দেশনার পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও ডিএনসিসি প্রশাসন এ বিষয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে।

​সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যার ভারসাম্য আনার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর ২৭(২) ও ২৯(১) ধারার আলোকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ওয়ার্ড সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি এখন চূড়ান্ত বিবেচনায় রয়েছে। চিঠিতে হাইকোর্টের আদেশের অংশ উল্লেখ করে বলা হয়, জনসংখ্যার ভিত্তিতে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

​খিলক্ষেত ও আশপাশের এলাকাগুলো বর্তমানে রাজধানীর দ্রুত বর্ধনশীল আবাসিক ও বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোর অন্যতম। গত এক দশকে এই এলাকার জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে নিকুঞ্জ, লেকসিটি, টানপাড়া ও কুড়াতলী এলাকায় দ্রুত বহুতল আবাসন সম্প্রসারণের ফলে নাগরিক চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো সেই ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের আদি সীমানার মতোই রয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

​স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্তমান ত্রুটিপূর্ণ ওয়ার্ড বিভাজনের কারণে খিলক্ষেত এলাকার জনগণ দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর জনপ্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত। পুরো খিলক্ষেত অঞ্চলটি বিভিন্ন ওয়ার্ডে খণ্ডিত ও বিভক্ত থাকায় এলাকার নাগরিক সমস্যাগুলো সিটি করপোরেশনের বোর্ডে সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। ফলে জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার, তীব্র ট্রাফিক সংকট, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মাদক প্রতিরোধ, লেক ও জলাশয় রক্ষা এবং পরিবেশ দূষণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে সমাধানহীন পড়ে রয়েছে।

​এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী জাহিদ ইকবাল এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “খিলক্ষেত অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে একটি বাস্তব ও চরম বৈষম্যমূলক সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে আমাদের সবসময় বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষের ট্যাক্সের টাকা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।”

​তিনি আরও বলেন, “টানপাড়া, নিকুঞ্জ, খাপাড়া, নামাপাড়া, কুড়াতলী ও লেকসিটির মতো এলাকাগুলো আজ বাস্তবিক অর্থেই একটি আধুনিক ও স্বতন্ত্র নগর জনপদে পরিণত হয়েছে। এখানে লাখো মানুষের বসবাস, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বড় বড় আবাসিক প্রকল্প ও বাণিজ্যিক সদর দফতর গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই তুলনায় নাগরিক সেবা ও জনপ্রতিনিধিত্ব কাঠামো এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমান ওয়ার্ড বিভাজনের কারণে খিলক্ষেত এলাকার জনগণের ভোট ও জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটে না। বিভিন্ন ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধিরা খিলক্ষেতের মূল অংশকে প্রান্তিক এলাকা মনে করেন।”

​জাহিদ ইকবাল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নতুন ৯৬ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত হলে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তন হবে না, বরং খিলক্ষেতবাসীর দীর্ঘদিনের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে এলাকার মানুষ নিজেদের এলাকা থেকে যোগ্য, চেনা-জানা ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন। এতে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও গতিশীল হবে এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটবে।”

​স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে জনসংখ্যার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে। কোথাও কয়েক লাখ ভোটার নিয়ে একজন কাউন্সিলর হিমশিম খাচ্ছেন, আবার কোথাও তুলনামূলক খুব কম জনসংখ্যা নিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রকৃত জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করার এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাধ্যতামূলক।

​এদিকে সম্ভাব্য নতুন ৯৬ নম্বর ওয়ার্ড গঠনের খবর খিলক্ষেত, কুড়াতলী ও নিকুঞ্জ এলাকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন এটিই প্রধান আলোচনার বিষয়।

বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, নতুন ওয়ার্ড গঠিত হলে এলাকার নাগরিক সেবা বৃদ্ধি পাবে, মশার উপদ্রব ও জলাবদ্ধতার দ্রুত সমাধান হবে এবং নিজেদের সুখ-দুঃখে পাশে পাওয়ার মতো একজন ঘরের মানুষকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেওয়া সম্ভব হবে।

​তবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস একটি অত্যন্ত জটিল আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান, যাতায়াত ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সুবিধাসহ একাধিক সূচক সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে। তবে আদালতের নির্দেশনা থাকায় কাজ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

পড়ুন : ধানের শীষ জানে ফারাক্কার সমাধান কেমন করে করতে হবে : তথ্যমন্ত্রী

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন