বিজ্ঞাপন

ওসমান হাদি হত্যার তিন আসামিকে ফেরানো নিয়ে আবার তোড়জোড়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

শুরু থেকেই ইনকিলাব মঞ্চ দাবি করে আসছে দেশীয় চক্রের সহযোগিতায় ভারতীয় আধিপত্যবাদ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে। সেই দাবি এখন আবার ডালপালা মেলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

ইনকিলাব মঞ্চ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য এটিই ইঙ্গিত করে যে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে, যার পরিচয় প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

সংগঠনটি বলছে, ওসমান হাদিকে কেবল আওয়ামী লীগ-বিরোধী অবস্থানের কারণে হত্যা করা হয়েছে বলে ধরে নিলে ভুল হবে। এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের কোনো ভূমিকা ছিল কি না তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তারা বলছে, হত্যাকাণ্ডের পরপর সীমান্ত সিল করার কথা থাকলেও তা করতে রহস্যজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে তখনকার সরকার।

ওসমান হাদি হত্যা মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করে। বর্তমানে এটি অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এই বক্তব্য তদন্তের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ, তা খতিয়ে দেখবে সিআইডি। এ বিষয়ে সিআইডি জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান এবং নতুন যেকোনো তথ্য সামনে এলে তা আমলে নিয়ে আরও গভীরভাবে তদন্ত চালানো হবে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, হাদি হত্যাকাণ্ডের পর মূল অভিযুক্তরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেঘালয় হয়ে কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) কর্তৃক গ্রেপ্তার হয় তারা। এই তিন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য ও রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে। তাদের ফিরিয়ে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আবারও চিঠি পাঠানো হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি। এজন্য প্রায় এক বছর আগে থেকে শুরু করেছিলেন অভিনব প্রচারণা। এর মধ্যেই গত বছরের ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদিকে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে গুলি করে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ১২০(বি)/৩২৬/৩০৭/১০৯/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

এ বছরের ৬ জানুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ থেকে হাদিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

ডিবির দেওয়া চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭) ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), হুমায়ুন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার লিমা (২১), কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও ফয়সাল (২৫)।

চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে ১৫ জানুয়ারি আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন।

ডিবির দাখিল করা চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে ১১ জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। বাকি ৬ জন পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ, তার সহযোগী আলমগীর হোসেন, রাজধানীর মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফিলিপ স্নাল, মুক্তি আক্তার এবং ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তার।

শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার মোটিভ তুলে ধরে সেই সময়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ফয়সাল নিজেও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভুক্তভোগীর পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের পরিকল্পনায় ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ড হয়।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৭ আসামির কার কী ভূমিকা ছিল সে সম্পর্কে তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থা ডিবি জানিয়েছিল, শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর। ঘটনার দিন দুজন হাদিকে অনুসরণ করছিলেন। মোটরসাইকেলে করে পেছন থেকে এসে রিকশায় বসা হাদিকে গুলি করা হয়। চালকের আসনে ছিলেন আলমগীর হোসেন আর পেছনে বসে থাকা ‘শ্যুটার’ ফয়সাল গুলি করেন।

তদন্ত অনুযায়ী, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনের পলায়নে ‘সার্বিক সহায়তাকারী’ হিসেবে ভূমিকা রাখেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর ও পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী।

এছাড়া মূল আসামিদের পালাতে ও সীমান্ত পার করে দিতে ফয়সালের পরিবারের সদস্যসহ আরও ১২ জন বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন বলে পুলিশের অভিযোগে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ফয়সালের দুলাভাই মুক্তি মাহমুদ, বোন জেসমিন, বাবা হুমায়ুন, মা হাসি, স্ত্রী সাহেদা, শ্যালক ওয়াহিদ, বান্ধবী মারিয়া এবং ঘনিষ্ঠজন কবির তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সাহায্য করেন।
অন্যদিকে, আসামিদের পালিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে ভাড়ায় চালিত গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন নুরুজ্জামান। পরবর্তীতে ফিলিপ, সিবিয়ন, সঞ্জয় ও আমিনুল নামে চার ব্যক্তি ফয়সালকে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে সরাসরি সহায়তা করেন। অভিযোগপত্রভুক্ত সবশেষ অর্থাৎ ১৭ নম্বর আসামি ফয়সালকে গ্রেপ্তারের পর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন তথ্য পাওয়া গেলে বা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে সম্পূরক অভিযোগ দাখিল করা হবে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে এক নারী ও দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন