নেত্রকোনার কলমাকান্দায় মাদক মামলায় অভিযুক্ত নিজ ছেলেকে বাঁচাতে পুলিশের তথ্যদাতা এক মাওলানাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় অবশেষে খারনৈ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. গেদু মিয়াকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার (৬ জুন) রাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কলমাকান্দা উপজেলা শাখা তাকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কলমাকান্দা উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক জিহাদ খান (মিতুল) স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, কলমাকান্দা উপজেলা শাখার সভাপতি এম.এ খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ভূঁইয়া আজ (৬ জুন) গেদু মিয়াকে অব্যাহতির এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে শনিবার থেকেই খারনৈ ইউনিয়ন শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন দলটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. বাবুল মিয়া।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ মে উপজেলার উত্তর রানীগাঁও গ্রামের মাওলানা শফিকুল ইসলামের বাড়ির পেছনে মাদকের উপস্থিতি টের পান তার বোন হাফসা খাতুন। বিষয়টি তিনি তার ভাই শফিকুলকে জানালে, তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কলমাকান্দা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল্লাহ আল নোমানকে বিষয়টি অবহিত করেন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান চালায়।
অভিযানে পাঁচ বোতল ভারতীয় ‘ভদকা’ ব্র্যান্ডের মদসহ ফাহিম মিয়া (১৬) ও হাসান (১৬) নামের দুই কিশোরকে আটক করে পুলিশ। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায় হৃদয় (১৭) নামের আরেক তরুণ। স্থানীয়দের তথ্যমতে, পলাতক হৃদয়ই হলেন সদ্য বহিষ্কৃত খারনৈ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গেদু মিয়ার ছেলে। এ ঘটনায় এসআই নোমান বাদী হয়ে ওই তিনজনকে আসামি করে মাদক মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের অভিযানের পর থেকেই মাওলানা শফিকুলের ওপর নেমে আসে বিএনপি নেতা গেদু মিয়া ও তার ছেলে হৃদয়ের ক্ষোভ। ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডে। প্রথমে ছেলে হৃদয় মাওলানা শফিকুলকে ফোন করে কৈফিয়ত চায় এবং দাবি করে তার (মাওলানা) কারণে দুটি ছেলের জীবন শেষ হয়ে গেছে। শফিকুল নিজে কাউকে ফাঁসানোর কথা অস্বীকার করে জানান, তিনি কেবল মেসেজ ও লোকেশন পুলিশকে দিয়েছেন।
এরপরই বিএনপি নেতা গেদু মিয়া মাওলানা শফিকুলকে ফোন করে জেরা করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করেন এবং শফিকুলের মা’কে তুলেও গালি দেন। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তাদের মোবাইল ফোনে ক্রমাগত অকথ্য ভাষায় গালাগালি এবং শফিকুলের ছোট বোনের সম্মানহানির হুমকিও দেওয়া হয়। হুমকির মুখে চরম নিরাপত্তাহীনতায় মাওলানা শফিকুল এলাকায় আসতে পারছেন না।
এ ঘটনার পর গত ৪ জুন ‘নাগরিক ডটকমে’ প্রকাশিত প্রতিবেদনে গেদু মিয়া দাবি করেছিলেন, তিনি কোনো মাওলানাকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং একজন ‘বাটপার’কে শাসন করার জন্য গালিগুলো দিয়েছিলেন। তিনি তার ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা মাদক কারবারের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, তার ছেলের বয়স মাত্র ১৩-১৪ বছর। পুলিশের হাতে আটক দুই কিশোরকে ছাড়ানোর জন্য ‘সুপারিশ’ করতে সে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল, মাদক বিক্রি করতে নয়।
গত ৪ জুন কলমাকান্দা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখছি। অভিযোগ সত্য হলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তার সেই প্রতিশ্রুতির মাত্র দুই দিনের মাথায় দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া, সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দায়ে গেদু মিয়াকে দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলো কলমাকান্দা উপজেলা বিএনপি। দলীয় হাইকমান্ডের এমন দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
পড়ুন : জাবির দুই নতুন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল ও অধ্যাপক নজরুল


