বিভিন্ন দিক থেকে এবারের ফিফা বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এক অনন্য আয়োজন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) যৌথভাবে অনুষ্ঠিত এই আসরে থাকবে রেকর্ড সংখ্যক ৪৮ দল ও ১০৪ ম্যাচ। পাশাপাশি, এবারের আসর হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসে এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তিনির্ভর টুর্নামেন্ট, যেখানে খেলা ও ম্যাচ পরিচালনায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির একাধিক উন্নত ব্যবস্থা। রেফারিংয়ের নিখুঁত সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে মাঠের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ, সবখানেই এবার জায়গা করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি।
নতুন যা থাকছে এবারের বিশ্বকাপে
১. সেন্সরযুক্ত ম্যাচ বল
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হবে অ্যাডিডাসের নতুন ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’ (স্প্যানিশে যার অর্থ তিন ঢেউ)। এই বলের ভেতরে বসানো আছে একটি ছোট ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ) সেন্সর চিপ, যা প্রতি সেকেন্ডে ৫শ’ বার বলের গতি, অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এই তথ্য সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিস্টেমে পাঠানো হবে। এর ফলে অফসাইডসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হবে।
২. এআই-চালিত ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) প্লেয়ার মডেল ও রেফারি ক্যামেরা
ফিফা ও লেনোভোর অংশীদারিত্বে খেলোয়াড়দের থ্রি-ডি ডিজিটাল মডেল (অ্যাভাটার) তৈরি করা হবে, যা দিয়ে খেলোয়াড়দের দ্রুত স্ক্যান করে তাদের শরীরের সঠিক মাপসহ ভার্চুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করা হবে এবং সেটি অফসাইড ও ম্যাচ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হবে। এছাড়া রেফারিদের শরীরে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, যাতে দর্শকরা মাঠের ভেতর থেকে খেলা দেখার মতো অভিজ্ঞতা পেতে পারেন।
৩. রোবট কুকুর
এবারের আসরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হবে রোবোটিক কুকুর। এই চার-পা বিশিষ্ট রোবটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করে লাইভ ভিডিও পাঠাবে, যা পুলিশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। বিশেষ করে মেক্সিকোর কিছু শহরে এগুলো মোতায়েন থাকবে।
৪. উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি
লাইনসম্যান দেরিতে অফসাইডের পতাকা তোলায় হতাশ? সেই হতাশা হয়ত কেটে যাবে এবারের আসরে। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফিফা একটি উন্নত আধা-স্বয়ংক্রিয় (সেমি অটোমেটেড) অফসাইড প্রযুক্তি চালু করেছে, যা ম্যাচ অফিসিয়ালসদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। নতুন এই সিস্টেম এখন আরও নিখুঁতভাবে অফসাইড শনাক্ত করতে পারবে।
এর আগের আসরে ব্যবহৃত সিস্টেম যখন কোনো খেলোয়াড় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকত, তখন রেফারিদের সতর্ক করতো। তবে এবারের সিস্টেমে কোনো খেলোয়াড় ১০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে গেলেই সংকেত দিয়ে জানাবে রেফারির ইয়ারপিসে।
তবে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে এটির, যেমন জটিল পরিস্থিতিতে বা খেলোয়াড়দের অবস্থান খুব কাছাকাছি থাকলে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না সিস্টেমটি।
৫. বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রথম কুলিং ব্রেক চালু হয়েছিল। ব্রাজিলের যে সব ভেন্যুতে তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল, সেই ভেন্যুর ম্যাচ গুলোতে দেওয়া হতো কুলিং ব্রেক। তবে এবারের বিশ্বকাপে আবহাওয়া যাই হোক না কেন প্রতিটি ম্যাচেই থাকবে ৩ মিনিটের পানি বিরতি। এই বিরতি সাধারণত প্রতিটি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে (প্রায় ২২তম মিনিটে) নেওয়া হবে, যাতে খেলোয়াড়দের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু বড় টুর্নামেন্টই নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে একটি ‘টেক-ড্রিভেন ফুটবল ইভেন্ট’, যেখানে এআই, সেন্সর, রোবট ও উন্নত ডাটা সিস্টেম ফুটবলের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
(সূত্র: আল জাজিরা)
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

