জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত এই বাজেট আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
পুরো বাজেট বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রা পেরিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে আমি আজ এই মহান সংসদে আমাদের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনের জন্য দাঁড়িয়েছি।
শুরুতেই বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের এবং নির্যাতিত নারীসহ সকল আত্মত্যাগী মানুষদের। একইসঙ্গে স্মরণ করছি স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে আত্মদানকারী সকল শহিদ এবং গুম-খুন-হামলা-মামলা ও গুলিবর্ষণের শিকার সকল আহত যোদ্ধাকে, যাদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় জীবনে গণতন্ত্র, অধিকার ও নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
দেশ ও জনগণের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বরাবরই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়েছে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের শাসনের বিরুদ্ধেও এদেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে বিএনপির নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেটিই ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের জমিন তৈরি করেছে। এই জমিনের ওপর দাঁড়িয়েই সংগঠিত হয়েছে ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, মেরামত ও রূপান্তরের ৩১ দফার পথ ধরে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আরও সম্প্রসারিত প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে উপস্থাপন করেছে। আমরা যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করেছি সেটা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করার ঘোষণাও ইতোমধ্যে তিনি জাতির সামনে দিয়েছেন।
অনেক আগে থেকেই বিএনপি এই রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে এই কারণে যে ফ্যাসিবাদ দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন (socio-cultural fabric) যেভাবে ধ্বংস করেছে তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়।
কিন্তু এটাও একই সাথে মনে রাখা দরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ (Economic Democratisation) অর্থাৎ সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনা সম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া এই রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।
১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ সময়ে বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে সকল প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করেছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে মূলত লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মৌল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই অবস্থার কেবল পুনরুদ্ধারই নয়, একে উত্তরণ ও সমৃদ্ধ পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপির ওপরে জনগণ যে ভরসা রেখেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সেই দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে আমরা জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে কেবলমাত্র সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ না, বরং আমাদের দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়নের পথ-নকশার অংশ হিসেবে বাজেট উপস্থাপন করছি। আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট হবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণে সরকারের অভিপ্রায়ের একটি প্রতিফলন।
আগেই উল্লেখ করেছি ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষুদ্র দলীয় ও গোষ্ঠীগত দুরভিসন্ধিই ছিল প্রধান প্রবণতা। ফলে একদিকে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হস্তগত হয়েছে এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যর্থতাগুলোকে ঢাকা হয়েছে মিথ্যা পরিসংখ্যান ও কথার ফুলঝুরি দিয়ে।
ফলে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকা শক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে। আমরা সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই নতুন যাত্রার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছি। নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের ওপর জোর দিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলাম। সরকার গঠনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সে লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছি।
জনগণের গৌরবময় গণঅভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে তৈরি হওয়া নতুন গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের এই অনন্য অভিযাত্রার শুরুতেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে আমরা নতুন ও তীব্রতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।
আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সাথে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশ (Longevity Dividend)-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও (Democratic Dividend) অর্জন করবে।
সেই লক্ষ্যের আলোকে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। এজন্য সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে-
সবার জন্য উন্নয়ন: আমাদের লক্ষ্য সর্বজনের, সর্বশ্রেণীর, সর্বখাতের, সকল অঞ্চলের সুষম অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।
সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবমুখী দক্ষতা-নির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানব সম্পদে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত, মৌলিক অধিকার হিসেবে সবার জন্য মানসম্পন্ন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক (Life Cycle Based) সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে সকল বয়সের, সকল স্তরের নাগরিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করা।
বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
বিনিয়ন্ত্রণকরণ (Deregulation) এবং সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ: বিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহার করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহ প্রদান।
জ্বালানি নিরাপত্তা: উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলা।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ: একটি অভিমুখমুখী, গতিশীল ও প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করা।
প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত বিবেচনার পাশাপাশি, নদীসমূহের নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা।
এসব অগ্রাধিকারের পাশাপাশি মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি (Creative Economy), ক্রীড়া অর্থনীতি (Sports Economy), সবুজ অর্থনীতি (Green Economy) এবং সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy)-এর মত খাতগুলোকে আমরা জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাই।
বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ও বাস্তবায়নে আমরা নীতিগতভাবে প্রধান বিবেচনায় রাখছি, ভ্যালু ফর মানি (Value for Money) অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার; রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (Return on Investment) অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসকল প্রকল্পে নিয়োজিত হচ্ছে তার কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন; কর্মসংস্থান সৃষ্টি (Job Creation) অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা; পরিবেশগত বিবেচনা (Environmental Consideration) অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মর্যাদাবান বাংলাদেশের ভিত রচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই বাজেটে তার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোকেই আমরা প্রতিফলিত করেছি। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ ও শোভন, রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতামূলক এবং সকল শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের উন্নয়নের অভিযাত্রায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আগামী এক বছরের নীতি-পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
(ক) সামষ্টিক অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র
আমি বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ের সঙ্গে বিএনপির পূর্বতন সরকারের সময়ের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসমূহের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি…
২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৬.৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তীতে পতিত সরকারের সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৪.২২ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৫-০৬ সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১.৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। সম্পদের অসম বণ্টন ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়ভিত্তিক জিনি কোফিশিয়েন্ট ছিল ০.৪৬৭, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী ০.৪৯৯-এ পৌঁছেছে।
রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত নিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে; এখনও তা ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।
২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩.৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৫.৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy Ratio) ছিল ৭.৩ শতাংশ, ২০২৫ সালের শেষে ঋণাত্মক অর্থাৎ -২.৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
২০০৫-০৬ অর্থবছরের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৮.৩ শতাংশ থেকে অনেক কমে ২০২৪-২৫ এ ৬.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, স্ক্যাম ও ভুল নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং এর ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট করা হয়েছে। বিএনপি সরকার যত বার এদেশে সরকার পরিচালনা করেছে কখনোই ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ পুঁজিবাজারে কোন সংকট সৃষ্টি হয়নি। ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে প্রায় ৬.৫ গুণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।
আমাদের রেখে যাওয়া অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি থেকে প্রায় ১৬ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় যা সত্যিই উদ্বেগের।
সুদ ব্যয় ২০০৫-০৬ সালে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে ১৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৩-২৪ সালে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণমান আমাদের রেখে যাওয়া ‘নিম্ন’ ঝুঁকি ক্যাটাগরি হতে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির দেশে অবনমন হয়েছে।
২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১.৬ ও ১২.২ শতাংশ। পক্ষান্তরে, ২০২৩-২৪ সালে সূচক দুটির প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক।
২০০৫-০৬ সালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ৬৮ টাকা হতে ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে, যা বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব ফেলছে।
(খ) বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও তার প্রভাব (মধ্যপ্রাচ্য সংকট)
আমাদের সরকার গঠনের ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু হয়। অর্থনীতিতে আকস্মিক ঝুঁকি তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে, ফলে মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রবাসী জনশক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। তাই ঐ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কারণে কর্মসংস্থান ও প্রবাস আয়প্রবাহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
আজকের বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা একটি স্থায়ী প্রেক্ষাপট (Neo-Normal)। যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি, বাণিজ্য শুল্কের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন; এসবের যেকোনো একটি ঘটনাই অল্প সময়ের মধ্যে দেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কাজেই আমাদের লক্ষ্য হলো বাইরের ধাক্কা এলেও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর অভিঘাতের মাত্রা মোকাবিলা করে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা।
তৃতীয় অধ্যায়
সরকারের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতি-কৌশল
দেশের বর্তমান বাস্তবতা পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে ফ্যাসিবাদী সরকারের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে আমরা বিশ্বাস করি যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক নীতি, কার্যকর সংস্কার ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সৃজনশীলতা, শ্রম, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল সক্ষমতার ওপর। সে কারণে, বর্তমান সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ফলে, উন্নয়নের সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।
এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা অর্জন, পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে মধ্যমেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করেছি।
এই কাঠামোর আওতায় ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে আমরা দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করতে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২.৭ শতাংশে উন্নীত করতে এবং মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে আমাদের সরকার এই পরিকল্পনা তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করবে, যাকে আমরা 3R (Recovery & Stabilization, Restoration and Reconstruction for Acceleration Strategy) কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছি।
আমাদের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম, যা এক বছর মেয়াদি। দ্বিতীয় ধাপ, অর্থনীতির উত্তরণ, যা বর্তমান সরকারের এক থেকে তিন বছর মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তৃতীয় ধাপ, সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণ, যা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানি নির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবচিতি (depreciation) এবং উচ্চ বিনিময় হার দেশে মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। এজন্য একটি স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা বজায় রাখতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণে জোর দেয়া হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত রাখা হবে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ যাতে বিঘ্নিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে করনীতি প্রণয়ন করা হবে।
কর ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা হবে এবং কর ব্যবস্থায় জনগণের হয়রানি নিরসন করে আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
বর্তমানে কর-জিডিপি’র অনুপাত ৬.৮ শতাংশ, যা আমরা আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ৯.৬ শতাংশে এবং রাজস্ব-জিডিপি’র অনুপাত বর্তমান ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করব।
ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ও অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ এবং তার অর্থায়নের জন্য বিপুল পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করায় আমাদের Debt Sustainability ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আমরা বর্তমান ‘মধ্যম’ মানের ঝুঁকি থেকে ‘নিম্ন’ ঝুঁকির ঋণমানে ফিরে আসতে চাই। তাই, আমরা রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি একটি সহনীয় পর্যায়ে রেখে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাই।
আমরা বিশ্বাস করি, অতীতের ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে পেরিয়ে এসে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার সময় এসেছে। তাই, টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতিকৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।
অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ প্রবাহ সচল রাখতে সরকারের মধ্যমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়নের মাধ্যমে এ খাতের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্যে- খেলাপি ঋণ হ্রাস, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা জোরদার করা হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকসমূহের আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনঃমূলধনীকরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য, দুর্বল ব্যাংকসমূহের পুনঃমূলধনীকরণের জন্য চলতি অর্থবছরে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত প্রদানের লক্ষ্যে ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনায় রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হয়েছে। এটিকে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা হবে, যাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি বাড়িয়ে নারী, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে। আমাদের সরকার দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।
আমরা ঋণ নির্ভর বিনিয়োগকে ইকুইটিতে রূপান্তর করছি। আমাদের লক্ষ্য বর্তমান ঋণভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দূরে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক (Investment & FDI) অর্থনীতি গড়ে তোলা। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট, এবং বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে, যাতে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমে। কর্পোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উপকরণের উন্নয়ন চলমান আছে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে কর্পোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড (Municipal Bond) ইস্যুর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।
সরকার শিল্প, সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। শ্রমবাজারের চাহিদাদোভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহায়তা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ‘মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সকল ধরনের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ যোগ্যতাই প্রধান মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করা হবে। সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবত একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারিদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত বৈষম্য কমিয়ে সমতাভিত্তিক সুষম উন্নয়নে বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এবারের বাজেট প্রণয়ন ও সরকারের মধ্যমেয়াদি নীতি-কৌশল নির্ধারণে বাজেট পূর্ববর্তী অংশীজনদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনায় প্রাপ্ত সুপারিশসমূহ সক্রিয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। বর্তমানের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমরা মনে করি, নতুন বাজেট অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা বিকাশ এবং উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করা হবে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে বেসরকারি খাত হবে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি এবং তরুণ ও নারীদের জন্য সৃষ্টি হবে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
চতুর্থ অধ্যায়: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট
সার্বিক রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের অগ্রগতি বিবেচনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কিছুটা সংশোধন ও সমন্বয় করতে হয়েছে। সংশোধিত বাজেটের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী পরিশিষ্ট ‘ক’ এর সারণি-১ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধিত রাজস্ব আয়: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা মূল বাজেট হতে ২৪ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করছি।
প্রস্তাবিত সংশোধিত ব্যয়: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছিল মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে সরকারি ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকা হ্রাস করে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
সংশোধিত বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন: চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি প্রস্তাব করছি ২ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ৩.৩ শতাংশ।
পঞ্চম অধ্যায়: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট
এ পর্যায়ে আমি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামোর ওপর আলোকপাত করছি। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত আয় ও ব্যয়ের একটি চিত্র পরিশিষ্ট ক এর সারণি-২ তে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছি।
প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস হতে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করছি।
প্রস্তাবিত ব্যয়: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ এবং বিগত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। আমরা ক্রমান্বয়ে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। সে লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ (সংশোধিত) ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় চলতি অর্থবছরের ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাত ও তৃণমূলের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির খাতওয়ারি বরাদ্দ পরিশিষ্ট ‘ক’ এর সারণি-৩ তে তুলে ধরা হয়েছে।
সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো: সামাজিক অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো এবং সাধারণ সেবা খাত; এ তিনটি অংশে বিভক্ত আমাদের সামগ্রিক ব্যয়ের কাঠামো পরিশিষ্ট ‘ক’ এর সারণি-৪ তে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬.১৩ শতাংশ। সামাজিক খাতের বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিফলন।
প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস হতে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস হতে নির্বাহ করার জন্য প্রস্তাব পেশ করছি। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্বাহ করা হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমরা ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা হ্রাস করার প্রস্তাব করেছি।
ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ব্যাপকভাবে ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ পরিশোধ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২.৯ শতাংশ। পক্ষান্তরে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৪.০৫ শতাংশ হয়েছে।
এ অবস্থা হতে উত্তরণে আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্ন সমৃদ্ধ খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়ন করছি। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত হবে, অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাল্টিপ্লায়ার প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অধিকতর গতিশীল হবে।
ষষ্ঠ অধ্যায়: খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার
এ পর্যায়ে সরকারের অগ্রাধিকার অনুসারে খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ও প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরছি; খাতভিত্তিক বিস্তারিত বরাদ্দ পরিশিষ্ট ‘ক’: সারণি ৪-এ সংযোজিত।
প্রস্তাবিত বাজেটে সম্পদ সঞ্চালনে শিক্ষা ও মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য, দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ সময়ে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামোর সবচেয়ে সংকটাপন্ন খাতগুলোর একটি ছিল শিক্ষা। তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আজ আমরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ফিরে এসেছি, সেখানে অবশ্যই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সৎ, যোগ্য, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা কারিকুলামকে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করছেন, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানবিক চরিত্রের বিকাশ ঘটে। আমরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য এমন পরিবেশ করতে চাই যাতে তারা আধুনিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে নিজেদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে।
আমরা শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি।
আমরা শিক্ষা কারিকুলামে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই।
আমরা সেই কাঠামো গড়ে তুলতে চাই, যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার নিজ মেধা, পছন্দ বা আগ্রহ অনুযায়ী দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তিবিদ, কৃষি উদ্যোক্তা, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ক্রীড়াবিদ কিংবা অন্য যেকোনো পেশায় সমান মর্যাদা ও সাফল্যের সঙ্গে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে ক্লাব ভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম যেমন- বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করা হবে।
বাংলাদেশেকে একটি দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালু করা হবে।
শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা যেমন- জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ইত্যাদি কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ লক্ষ্যে আমাদের সরকার তৃতীয় ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে সেসকল দেশে উচ্চশিক্ষায় গমনেচ্ছুদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা প্রদান করছে।
মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও স্কুলব্যাগ সরবরাহ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং বিশেষায়িত সহায়ক প্রযুক্তি ও শিক্ষাসামগ্রী প্রদান করা হবে।
ছাত্র-ছাত্রীদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু ও পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ এবং ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের স্যানিটেশন ও হাইজিনকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।
প্রযুক্তি ও AI নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।
শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ, এপ্রেনটিসশীপ ও ইন্টার্নশিপ সুবিধা এবং স্টার্ট-আপ চালুকরণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে।
আমরা ‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছি। বিদেশে বসবাসরত বৈশ্বিক জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব প্রদান এবং কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করবে। আমরা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে চাই।
আমরা শিক্ষা খাতে আগামী অর্থবছরে শিক্ষাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করে সর্বমোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ
একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনই টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। ফ্যাসিবাদী সময়ে স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ ক্রয়ে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তার একটি বড় অংশই দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে, তাই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হয়নি। সে কারণে, আজ দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, আর বিপুল সংখ্যক রোগী বিদেশমুখী হওয়ায় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য হবে-
সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ;
চিকিৎসা-কেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর;
গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া;
মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান জোরদারকরণ;
স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো।
আমরা স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি।
নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদান করা হবে।
জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে;
সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে পুঞ্জীভূত করা হবে; করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, ইত্যাদি ব্যবস্থা থাকবে; রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবের জন্য ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন করা হবে;
সরকার একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের খর্বাকৃতি (Stunting) মোকাবিলায় সরকার বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।
API (Active Pharmaceutical Ingredient) শিল্প পার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে। এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ওষুধ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ, উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা ও সহায়ক নীতিগত সুবিধা প্রদান করা হবে। দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ ও টিকা পৌঁছানো সম্ভব হয়।
আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে যে, বিগত সরকারগুলোর টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে অবহেলা ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশু মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা প্রদান করেছে। ইন্টিগ্রেটেড মডুলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং AI-ভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতা-ভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে; দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে ৫,০০০ এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং নার্সিং বিষয়ে ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।
স্থানীয় ও বৈদেশিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ৪ মাস মেয়াদি ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইস শিল্পকে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সীমিত আয়ের মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমানো, মানসম্মত ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, জিডিপি’র ০.৫৮ শতাংশ।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: কৃষি খাত
আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হলো কৃষিকে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করা। কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তর আনতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ১০টি সেবা পৌঁছে দিতে সরকার চলতি বছরের পহেলা বৈশাখ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০০ উপজেলায় ৪২.৫ লাখ কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করা হবে এবং দেশের সকল কৃষককে পর্যায়ক্রমে ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকগণ প্রতি বছর একবার ২,৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। আমি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে কৃষক কার্ড বাবদ ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে গৃহীত সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ কর্মসূচি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং এ বাবদ চলতি অর্থ বছরে ১ হাজার ৫ শত ৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।
কৃষির সার্বিক উন্নয়নের জন্য আমরা নিম্নলিখিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি- কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ভর্তুকি মূল্যে কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ও সাশ্রয়ী উৎপাদন নিশ্চিত্তে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড স্টোরেজ ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আম চাষিদের জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলে বিশেষ হিমাগার স্থাপন করা হচ্ছে। কৃষি উপকরণ বিতরণ, কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পাদনের লক্ষ্যে কৃষক ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
ইতিপূর্বে বিএনপি সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ বাংলাদেশের একটি সফল সামাজিক আন্দোলনের নাম, যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুনরায় চালু করেছেন। এ কর্মসূচির আওতায় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
খাদ্য নিরাপত্তা
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ হলেও আমাদের সরকার এ বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ লক্ষ্যে- সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য ধারণ ক্ষমতা বর্তমান ২৩.১৬ লাখ মে. টন হতে বৃদ্ধি করে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৪.৫০ লাখ মে. টনে উন্নীতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৩৮.১৯ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১.২৯ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৫ লাখ উপকারভোগী পরিবারকে কর্মাভাবকালীন ৬ মাসে ১৫ টাকা কেজি দরে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল প্রদান করা হচ্ছে। সারা দেশে ১ হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৪১৯ উপজেলায় অতিরিক্ত OMS কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন ভর্তুকিমূল্যে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। খাদ্যশস্যের বাজারদর পর্যবেক্ষণে অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ
নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে আমরা জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৫৬ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন মৎস্য উৎপাদন। সুনীল অর্থনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমরা প্রকৃত মৎস্যজীবী ও কৃষকদের সুরক্ষায় ‘জাল যার জলা তার’ নীতির ভিত্তিতে জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরগুলো স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ১৫ লাখ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ সুবিধার আওতায় আনার কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। মৎস্যচাষিদের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশে প্রথমবারের মতো মৎস্য বিমা স্কিম চালু এবং বাণিজ্যিক মৎস্য খামার যান্ত্রিকীকরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খামারের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত ‘ফিড’ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। গবাদিপশু পালনকারীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বিমা এবং বাজারজাতকরণ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে এ খাতের খামারিদের ইতোমধ্যে ‘কৃষক কার্ড’-এর আওতায় আনা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করার প্রস্তাব করছি যা জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬১ শতাংশ)।
সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষা
আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য হলো সকল নাগরিককে জীবনচক্রভিত্তিক পদ্ধতিতে সুরক্ষার আওতায় আনা, যাতে দারিদ্র্য হ্রাস পায়, বৈষম্য কমে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। এই কাঠামোর মূল দর্শন হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও স্বনির্ভরতা (Economic empowerment and self-reliance) অর্জন।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই। এ লক্ষ্যে সরকার বেশকয়টি কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যেমন-
সামাজিক সুরক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকল্পে আমাদের সরকারের সিগনেচার প্রোগ্রাম ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি’, যার কার্যক্রম সরকার গঠনের ১ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে পরিবারের প্রধান নারী ব্যক্তি মাসে ২,৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন।
২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম দেশব্যাপী বিস্তৃত করা হবে। ইতোমধ্যে পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান এবং এর বিপরীতে ১৪,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করছি। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা অব্যাহত রাখা হবে। ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য ট্রেনে সম্পূর্ণ ফ্রি এবং মেট্রোরেল ভাড়ায় ২৫% ছাড় দেয়া হবে।
প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩৮ লাখে বাড়ানো হবে এবং মাসিক ভাতা ১,০০০ টাকা করা হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভাতার সংখ্যা ১ লাখে উন্নীত করা হবে এবং স্তরভেদে মাসিক ভাতা ১,০০০ থেকে ১,৪০০ টাকা করা হবে। মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৮.৯৫ লাখ মা ও শিশুকে মাসে ৮৫০ টাকা দেয়া হবে। ক্যান্সারসহ ৬টি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের এককালীন সহায়তা ৫০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০,০০০ টাকা করা হবে।
বেসরকারি কর্মীদের জন্য সর্বজনীন পেনশন ফান্ডের আওতায় অবসর গ্রহণকালে মোট অর্থের ৩০% গ্র্যাচুইটি হিসেবে প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ২০,০০০ টাকা অপরিবর্তিত থাকবে। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের ভাতা ৫,০০০ টাকা করে বৃদ্ধি করে যথাক্রমে বীরশ্রেষ্ঠ ৪০,০০০ টাকা, বীর উত্তম ৩০,০০০ টাকা, বীর বিক্রম ২৫,০০০ টাকা এবং বীর প্রতীক ২৫,০০০ টাকা করা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবারের মাসিক ২০ হাজার টাকা এবং এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে আহতদের যথাক্রমে ২০, ১৫ ও ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা অব্যাহত থাকবে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: বিদ্যুৎ
বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এ খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে।
বিগত সরকারের সময়ে সম্পাদিত বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা আমাদের উপর চেপে বসেছে। এখানে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট (আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্যসহ) হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমাদের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগসমূহ হচ্ছে:
বিদ্যুৎখাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধপূর্বক এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ;
বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিদ্যুৎ খাতে নিবিড় মনিটরিং;
অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন এবং ‘লিস্ট কস্ট জেনারেশন’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন;
ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে এ খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ;
সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড উন্নয়নের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো;
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে উৎপাদন;
২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ এবং সঞ্চালন লাইন ২৫,০০০ সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ;
২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে প্রথম ইউনিট হতে জানুয়ারি ২০২৭ নাগাদ ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করা।
আমরা বিশ্বাস করি উল্লিখিত উদ্যোগসমূহের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা দেশে তুলনামূলক সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ
ফ্যাসিবাদী সরকারের জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী ভুল নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, আমদানি নির্ভরতা জ্বালানি খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে। এ সময় শুধুমাত্র তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এবং জ্বালানি তেল আমদানির ওপর জোর দেওয়া হয়। দেশের নিজস্ব স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে, জ্বালানি তেল রিফাইনিং ও মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল (ডিজেল) ও এলএনজি’র স্পট মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমরা সাধারণ জনগণের কষ্টের কথা বিবেচনা করে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করেছি এবং জ্বালানি তেলের দাম সামান্য সমন্বয় করেছি। অন্যদিকে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক ও মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছি।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার, রিফাইনিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানি উৎস বহুমুখীকরণসহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন-
জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যয় সাশ্রয়ী ও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে;
আমরা জ্বালানির কৌশলগত মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলবো। দেশের ভেতরে ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রাধান্য দিচ্ছি। দেশিয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার প্রদান করছি।
আগামী ৩ বছরে বাপেক্স এর মাধ্যমে ২৭০ কি.মি. ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কি.মি. টু-ডি (2D) সাইসমিক জরিপ এবং ৭০০ বর্গ কি.মি. থ্রি-ডি (3D) সাইসমিক জরিপ কার্যক্রম সম্পন্নকরণ;
মধ্যমেয়াদে বাপেক্স এর নিজস্ব রিগ দ্বারা ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি কূপের ওয়ার্কওভার সম্পন্নকরণ;
জ্বালানি অনুসন্ধানে সক্ষমতা বাড়াতে নতুন অনুসন্ধান রিগ (Exploration Rig) ক্রয়;
সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড’ ঘোষণা;
অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান আকর্ষণীয় করার জন্য দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (PSC) সংশোধন;
জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎস বহুমুখীকরণ নীতি অনুসরণ;
মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি পর্যালোচনা;
মহেশখালীর মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্তকরণ;
জ্বালানি তেল পরিবহনে নির্মিত ৬০১.৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার;
জ্বালানি তেল খালাসে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM) চালুর উদ্যোগ গ্রহণ;
চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লক্ষ মে.টন পরিশোধন ক্ষমতা সম্পন্ন নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণ।
আমাদের বিশ্বাস প্রস্তাবিত উদ্যোগসমূহের সফল বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত্তে সহায়ক হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা।
আইসিটি, টেলিযোগাযোগ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাত
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইসিটি এবং টেলিকম একটি বিপুল সম্ভাবনাময় সেক্টর। এ সেক্টর হতে পারে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। অথচ বর্তমানে দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র ১-২%। যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে দেশব্যাপী সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও উচ্চগতির (High Speed) ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দেশের সকল বিমানবন্দর, ৭টি রেলওয়ে স্টেশনসহ আন্তঃনগর ট্রেনে বিশ্বমানের উচ্চ গতির ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা চালু করা হয়েছে, যার সুফল জনগণ ইতিমধ্যে পেতে শুরু করেছে। সরকার গত ৪ মাসে ৪১ লাখ নতুন 4G মোবাইল সংযোগ এবং ৪ লক্ষ উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ প্রদান করেছে। এই খাতের টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সরকার নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগসমূহ বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন-
আগামী ২ বছরের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে 5G সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সকল মোবাইল অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনদের সাথে নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
দেশব্যাপী – শহর ও গ্রাম অঞ্চলে 100 Mbps (Mega Bits Per Second) to 1 Gbps (Giga Bits Per Second) উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিত করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণ সহজ ও নিরাপদ করতে এবং ক্যাশলেস ডিজিটাল ইকোনোমি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI) ও ‘One Citizen, One ID, One Wallet’ চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দেশ ও দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিদ এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তাসহ বেসরকারি খাতের অংশীজনদের সাথে নিয়ে সমন্বিত পলিসি ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক এবং সময়োপযোগী আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি শীর্ষস্থানীয় Global Electronics Manufacturing Hub এ রূপান্তর করার লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে।
মাননীয় স্পিকার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইলেকট্রনিক্স শিল্প এবং তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে জাতীয় উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-কে দেশের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে একটি বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এআই ব্যবহার করে স্মার্ট সিটি বিনির্মাণ এবং নাগরিক সেবাকে জনবান্ধব করা, শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ও দক্ষ করে করে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে আমাদের কর্মকৌশল নিম্নরূপ-
তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং AI প্রযুক্তি নির্ভর উদ্যোক্তা তৈরি করা।
সরকারি পরিকল্পনায় এবং সেবা প্রদানে AI Driven Data Center ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও কার্যকর এবং গতিশীল করা হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা হবে।
এসব উদ্যোগ বাংলাদেশকে একটি উদ্ভাবন নির্ভর, প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসাবে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তথ্য প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় এ খাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। এই অর্থ ‘স্টার্ট-আপ তহবিল’ হিসেবে, নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে, নারী উন্নয়নে এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যবহার করা হবে।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন
‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি।
শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা সুদৃঢ় করতে আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ জারি করেছি।
কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিক ও কর্মজীবীদের প্রতি যেকোনো প্রকার সহিংসতা বা যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি কার্যকর করা হবে। তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা অধিকতর সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। এছাড়া সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত ও নারীর ব্যবস্থাপনায় ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর করা হচ্ছে।
শিশু শ্রম বন্ধে ইতোমধ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ ও প্রবাসী বাংলাদেশি জনশক্তির সুরক্ষা ও কল্যাণে আমাদের সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রবাসী কর্মীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার একটি বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তন করছে। প্রবাসী কল্যাণ সেবা, বিমা, ব্যাংকিং সুবিধা এবং জরুরি সহায়তার সাথে কার্ডটি সংযুক্ত করা হবে।
বিকল্প শ্রমবাজার হিসাবে আমরা রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া- এই দেশগুলোর সঙ্গে ইতোমধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আমরা আবারও মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।
আমাদের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরের মাসেই অর্থাৎ মার্চ, ২০২৬ মাসে প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক রেমিট্যান্স ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। আমরা আশা করছি এই ধারা অব্যাহত থাকবে। সরকার প্রবাস আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখছে।
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শ্রম বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে অকুপেশন ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এমন খাতগুলোর জন্য খাতভিত্তিক কোর্স এবং পাঠ্যক্রম চালুর কাজ শুরু করেছি। বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম উন্নয়ন, সার্টিফিকেশন, অ্যাক্রেডিটেশন ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছি।
অর্থ বিভাগের অধীনে ‘Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program’ (SICIP)-এর আওতায় প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার জনকে বাজার-চাহিদাভিত্তিক মাঝারি হতে উচ্চতর দক্ষতার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কমপক্ষে ৬৫ শতাংশের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশ
আমাদের সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছি। আমাদের লক্ষ্য দেশের ক্রিয়েটিভ শিল্পের (Creative Industry) বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসা এবং বাংলাদেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১.৫ শতাংশে উন্নীত করা। এ খাতের টেকসই উন্নয়নে সরকারী, বেসরকারি এবং এনজিও খাতের সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণে কর্মপরিকল্পনা ইতোমধ্যে হাতে নিয়েছি।
ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিভিত্তিক পণ্য চিহ্নিতকরণ ও ডিজাইন উন্নয়নে সরকার বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে। দেশজুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তুলতে ১০ বছরের বিনিয়োগ ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যেমন-
ঢাকার পূর্বাচলে ১৬০ একর জায়গার ওপর পিপিপি মডেলে বিশ্বমানের একটি সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপনের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমী চত্বরে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক পর্যায়ের কলেজসমূহে ইনোভেশন হাব চালুর বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
সরকারের ‘১টি-গ্রাম-১টি-পণ্য’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিভিত্তিক পণ্য যেমন: তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প, বুনন শিল্প, শীতলপাটি, শতরঞ্জি, কাঠের খেলনা, হাতে তৈরি গয়না, টেরাকোটা, ইত্যাদিসহ আরও অনেক পণ্য চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ক্রিয়েটিভ পণ্যের উন্নয়ন ও নকশার মানোন্নয়নের জন্য দেশীয় ডিজাইনারদের সমন্বয়ে একটি ‘National Pool of Designers’ গঠন করা হচ্ছে;
বিসিকের আওতাধীন নকশাকেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এর ভিত্তিতে আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনারদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে;
অঞ্চলভিত্তিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (cultural heritage) এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা (heritage building) পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করছে, যেমন- ঐতিহ্যবাহী Heritage স্থাপনা Restore করে আন্তর্জাতিক উৎসব আয়োজনের লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ২-৩টি থিমের ওপর ভিত্তি করে দুটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
Heritage Restoration ও আন্তর্জাতিক উৎসব আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা চিহ্নিত করা হচ্ছে।
জাতীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক উৎসব, আঞ্চলিক উৎসব, ইত্যাদি বহুমুখী ও ঐতিহ্যমণ্ডিত কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে মাসভিত্তিক ও থিমভিত্তিক জাতীয় ও আঞ্চলিক ক্যালেন্ডার প্রস্তুতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আমরা পর্যটন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে ইকোট্যুরিজম উন্নয়নে বিশেষ নজর দিচ্ছি। এ লক্ষ্যে সরকার নিম্নোক্ত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে:
পর্যটন খাতের পেশাজীবীদের বিশ্বমানের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে।
রন্ধনশিল্প (Culinary Art)-সহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ট্রেডের প্রশিক্ষণকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার লক্ষ্যে International Hospitality Benchmark নির্ধারণ করা হবে;
পর্যটন খাতের প্রশিক্ষণার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত সংস্থা কর্তৃক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে;
পর্যটন খাতের সামগ্রিক সম্ভাবনা, বৈচিত্র্য এবং আধুনিক ক্রিয়েটিভ থিমগুলোকে (Creative Themes) অন্তর্ভুক্ত করে একটি সময়োপযোগী ও সমন্বিত ‘পর্যটন মহাপরিকল্পনা’ দ্রুত চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উৎসব ও বাজারে ক্রিয়েটিভ সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে ‘Created in Bangladesh’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ব্যাপকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে।
চলচ্চিত্রের উন্নয়ন এবং OTT প্লাটফর্মে অংশগ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি মানসম্পন্ন স্টুডিও গড়ে তোলা হবে।
আমি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর (CSR) খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা হবে।
ক্রীড়া উন্নয়ন
ক্রীড়া খাতকে শুধু বিনোদন নয়, বরং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির অধীনে আয় ও কর্মসংস্থানমুখী একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আমাদের সরকার-
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৩০০ জন ক্রীড়াবিদকে ক্রীড়া ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
আমরা ৬৪টি জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, সেটির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১০টি জেলায় স্পোর্টস ভিলেজের প্রাথমিক নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ১২-১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হবে। এতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিকস, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট, মোট ৮টি খেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ এ সারা দেশ থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ৪৯২ জন কিশোর ও ৪৭ হাজার ১৩০ জন কিশোরীসহ মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬২২ জন খেলোয়াড় নিবন্ধন করেছে। এ লক্ষ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আমি ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে।
বিনিয়োগ, শিল্প ও বাণিজ্য
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
এ লক্ষ্যে গৃহীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপসমূহ হলো-
Ease of Doing Business নিশ্চিত করতে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘BanglaBiz’ চালু করা হয়েছে;
১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে FDI আকর্ষণে হিট ম্যাপ প্রকাশ করা হয়েছে;
পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন ইপিজেড স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে, যেখানে প্রায় আড়াই লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে;
কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়ায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
সম্ভাবনাময় দেশসমূহের সাথে FTA (Free Trade Agreement), PTA (Preferential Trade Agreement) ও EPA (Economic Partnership Agreement)-সহ বিভিন্ন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে;
রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে ৮টি খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত পণ্য খালাস সুবিধা প্রদান করা হয়েছে;
কৃষিজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ফারমাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স, স্বর্ণ, ডায়মন্ডসহ সম্ভাবনাময় সকল শতভাগ রপ্তানিমুখী খাতকে কাস্টমস বন্ডেড সুবিধা অথবা শুল্কমুক্তভাবে ব্যাংক গ্যারান্টির সুবিধার আওতায় পণ্য আমদানির সুযোগ প্রদান করা হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ী ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, বাইক ও স্কুটার উৎপাদনে নীতিগত সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সহজীকরণে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘Stimulus Package-2026’ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা রিফাইন্যান্সিং তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। এ তহবিলের আওতায় ৫টি প্যাকেজ নিম্নরূপ-
I. বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা;
II. কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা;
III. সিএমএসএমই (CMSME) খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা;
IV. রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা; এবং
V. উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকা।
উক্ত আবর্তন স্কিমসমূহের অধীনে প্রদেয় ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার নমনীয় রাখার লক্ষ্যে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ২৫ লাখের অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রেখে রাজস্ব নীতি ও মুদ্রা নীতির মধ্যে সুসমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত একটি অনন্য প্রচেষ্টা।
এসএমই খাতের বিকাশে এ সেক্টরে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় সরকারি সংস্থা, যেমন- IDCOL, BIFFL এবং SME Foundation-এর মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন
গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, নগর ও গ্রামীণ সেবার সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ হলো-
সুপেয় পানি, শতভাগ স্যানিটেশন, ড্রেনেজ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্প্রসারণ;
গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ;
সড়ক, সেতু, গ্রোথ সেন্টার ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দুর্যোগ সহনশীলতা বৃদ্ধি করা;
জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ ও ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা;
ডিজিটাল জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ; এবং
সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাসমূহে বর্ষার আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, ড্রেন সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় খাতে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নারী, যুবক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ হলো-
দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন;
নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করা;
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, নারী ও যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন;
সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ;
ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা; এবং
গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
৭৩। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বাবদ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করছি।
যোগাযোগ অবকাঠামো
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
একইসঙ্গে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন-
মহাসড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে একটি মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলা;
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন;
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে।
অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা এবং পেশাজীবী চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার;
প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তুলতে সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিতকরণ;
রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকার যানজট নিরসন;
৬টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণ;
পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রিক বাস দ্বারা প্রতিস্থাপন;
দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ;
ইলেকট্রনিক টোল ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন
গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, নগর ও গ্রামীণ সেবার সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ হলো-
সুপেয় পানি, শতভাগ স্যানিটেশন, ড্রেনেজ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্প্রসারণ;
গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ;
সড়ক, সেতু, গ্রোথ সেন্টার ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দুর্যোগ সহনশীলতা বৃদ্ধি করা;
জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ ও ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা;
ডিজিটাল জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ; এবং
সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাসমূহে বর্ষার আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, ড্রেন সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় খাতে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নারী, যুবক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ হলো-
দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন;
নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করা;
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, নারী ও যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন;
সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ;
ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা; এবং
গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
৭৩। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বাবদ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করছি।
যোগাযোগ অবকাঠামো
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
একইসঙ্গে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন-
মহাসড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে একটি মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলা;
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন;
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে।
অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা এবং পেশাজীবী চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার;
প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তুলতে সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিতকরণ;
রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকার যানজট নিরসন;
৬টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণ;
পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রিক বাস দ্বারা প্রতিস্থাপন;
দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ;
ইলেকট্রনিক টোল ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
রেলপথ উন্নয়ন
নিরাপদ, আধুনিক ও দক্ষ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তঃদেশিয় সংযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলপথকে অধিক কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন-
সকল জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং বন্দরসমূহের সাথে রেল সংযোগ সম্প্রসারণ;
আধুনিক লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগন সংগ্রহ;
সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে কোচ ও লোকোমোটিভ সংযোজন (assembling);
ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ ও আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু; এবং
ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ও উচ্চগতির রেল সংযোগ চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকা-কুমিল্লা অংশে কর্ডলাইন নির্মাণ করা হবে, যার ফলে এ পথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে আসবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
নৌ-পরিবহন
ব্যয়-সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নৌপরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যেমন-
নৌপরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার;
ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং দক্ষতা উন্নয়ন;
নদীবন্দর ও লঞ্চঘাট আধুনিকায়ন;
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রান্সশিপমেন্ট সক্ষমতা বৃদ্ধি;
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, জেটি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে;
চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ;
নৌপথ সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ড্রেজিং ও খনন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে; এবং
আধুনিক নৌবন্দর অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সমন্বিত নৌপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ।
বেসামরিক বিমান পরিবহন
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যেমন-
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাবে উন্নীত করার উদ্যোগ;
জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড গড়ে তোলা;
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিকস ও যাত্রী হাবে উন্নীতকরণ;
কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলা;
বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি আধুনিক উড়োজাহাজ ক্রয়ের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর;
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল শিগগিরই চালুর প্রস্তুতি;
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রায় ৯৪ হাজার বর্গমিটার জায়গাজুড়ে ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হয়েছে;
জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা;
বৃহৎ পর্যটন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ খাতে পর্যটক আকর্ষণ ও বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনিয়োগ রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে; এবং
বাংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক সংযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও কার্গো ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদির গুরুত্ব বিবেচনায় যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন বাবদ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করছি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত অভিঘাতে জর্জরিত। আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ উদ্দেশ্য পূরণে আমাদের সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যেমন-
আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩.৫ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫,৯৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার চারা রোপণ। ৩,৭২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার চারা রোপণ। ৪,০০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭৬ হাজার চারা রোপণ। বসতবাড়ি বনায়নে ৫৬ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি কর্মসূচি’-এর আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নিজ বাসায় বা আঙিনায় ১ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে কার্বন ট্রেডিং কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘Circular Future Model’ বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিবেশ দূষণ রোধে আগামী অর্থবছরে নিম্নরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে, যেমন-
বায়ু দূষণ কমাতে ১৫টি CAMS এবং ১৬টি C-CAMS এর মাধ্যমে নিয়মিত বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা।
যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ-এর মাধ্যমে ১০টি আধুনিক Vehicle Inspection Centre স্থাপন করা হবে। ইলেকট্রিক বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন গাইডলাইন ও হালনাগাদ বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
Reduce, Reuse, Recycle (3R) নীতির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের গভীরতা ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অধীনে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা
সমন্বিত ও সার্বিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সেচ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন রোধ, ভূমি পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, লবণাক্ততা প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন-
সরকার দেশজুড়ে জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে ব্যাপক খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
আগামী ৫ বছরে ২০,০০০ কি.মি ‘নদী-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৬,৫৯৮ কি.মি. খাল খননের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩০৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও মেরামত এবং ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ করা হবে;
৪৮৪ কিলোমিটার নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি ও ডুবোচর অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে;
নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদী বা জলাশয় দখলমুক্ত ও পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁকখালী, বারনই নদী পুনরুদ্ধার এবং পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
হাওড়-বাওড় অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন এবং উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা নিরসন করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।
‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ৭ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। উক্ত প্রকল্পে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে; চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা সুবিধা ভোগ করবে। এছাড়াও, আমাদের সরকার দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার ৫ শত ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
আমাদের সরকার টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যেমন-
অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি EGPP কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২০ লাখ গ্রামীণ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ নারী।
চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিখা) খাতে ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) খাতে ১ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়ে গ্রামীণ অবকাঠামো সচল রাখা হয়েছে।
ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৫২১ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম ও ১১টি এরিয়াল প্ল্যাটফর্ম ল্যাডার ক্রয় করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (CPP) জন্য ১০০ ভাগ বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ৯ হাজার ৬৯ কোটি টাকা।
নারী ও শিশু উন্নয়ন
নারীর ক্ষমতায়নই উন্নয়নের নির্দেশক। তাই, নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীদের স্বনির্ভরতা এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এক্ষেত্রে আমরা নিম্নরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করেছি, যেমন-
কর্মজীবী নারীদের জন্য প্রথম ধাপে ২০টি এবং পরবর্তী ধাপে আরও ৬০টি আধুনিক দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
বিদেশ ফেরত নারী শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
ভিডব্লিউবি (Vulnerable Women Benefit) কর্মসূচির আওতায় ১০.৪ লাখ নারীকে মাসিক ৩০ কেজি চাল দেয়া হচ্ছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ‘কুইক রেসপন্স টিম’ অধিকতর শক্তিশালী করা হচ্ছে।
পথশিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন করা হচ্ছে।
ঝুঁকিতে থাকা সুবিধাবঞ্চিত ও বিপন্ন শিশুদের সুরক্ষায় বর্তমানে দেশের ১৭টি জেলায় ৩৩টি ‘সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র’ পরিচালিত হচ্ছে।
নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করছি।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি
আমরা ধর্মীয় বিভাজনের বিপরীতে সংহতি ও সাম্যে বিশ্বাস করি। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি নিশ্চিতকরণ, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সৃষ্টি, সকল ধর্মীয় প্রধানের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়ন, সুষ্ঠুভাবে হজ কার্যক্রম সম্পাদন, ইসলামী গবেষণা কার্যক্রম, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মসজিদের ক্ষেত্রে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমকে মোট ১০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পুরোহিত ও সেবায়েতকে মোট ৮ হাজার টাকা মাসিক ভিত্তিতে প্রদান করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত মোট ৬,৪৩৮টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯,৫২০ জনকে মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা প্রদান করা হয়েছে;
পর্যায়ক্রমে এ সুবিধা সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে আগামী বাজেটে এ বাবদ ১,০৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করছি।
ওয়াকফ সম্পত্তির অবৈধ উচ্ছেদ ও উদ্ধার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১১টি ওয়াকফ এস্টেটের ২৮.২০ একর সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে;
হজ ব্যবস্থাপনা অধিকতর সাশ্রয়ী, সহজ ও সাবলীল করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে;
আগামীতে ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়: রাজস্ব খাত সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
বাজেটের আকার ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশ আহরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। বিভিন্ন বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও আমাদের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রাজস্ব আহরণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান উদ্দেশ্য হলেও দেশে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার ক্ষেত্র বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রতিরক্ষণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
সরকারের লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এজন্য প্রয়োজন একটি ন্যায্য, প্রযুক্তিনির্ভর, সর্বজনীন ও পূর্বানুমানযোগ্য (Predictable) রাজস্ব কাঠামো, যা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্রকে (Investment-Production-Employment-Consumption-Tax Cycle) আরও গতিশীল করবে।
আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জসমূহ হলো; নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, কর অব্যাহতির বিস্তৃত সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র করভিত্তি, কর ফাঁকি ও ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি। এই চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে হ্রাস করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় End-to-End Automation এর মাধ্যমে কর প্রদান পদ্ধতি সহজীকরণসহ ব্যবসাবান্ধব নীতি সংস্কারের রূপরেখা গ্রহণ করেছি। এই বাজেট সেই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করবে, যা আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতাসক্ষম করে তুলবে।
আয়কর সংক্রান্ত বাজেট প্রস্তাবনা
ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের জন্য প্রগতিশীল করকাঠামোর প্রস্তাব
করদাতাগণ যাতে, ভবিষ্যতে মধ্যমেয়াদে তাদের কী হারে কর পরিশোধ করতে হবে তা সঠিকভাবে পূর্বানুমান (predict) করতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্যক্তিকরদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের আয়কর হার প্রস্তাব করছি।
কর্পোরেট কর
এবারের বাজেটে কর্পোরেট কর পরিপালন ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের ব্যবস্থা করা, অতিরিক্ত নিয়মের বেড়াজাল থেকে করদাতাদের রেহাই দেয়া, ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বাড়িয়ে এবং উৎসে কর কর্তন না করার কারণে খরচ অগ্রাহ্য করার বিদ্যমান বিধান বিলোপ করার মাধ্যমে করদাতার করযোগ্য আয় কমানো এবং করদায় কমানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেই সাথে, অডিটের জন্য কর মামলা নির্বাচন এবং উৎসে কর যাচাই এর জন্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও অটোমেটেড করার ওপর জোর দিচ্ছি। নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীগণকে মধ্যমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট হারে করারোপের নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে বিদ্যমান কর্পোরেট কর হার আগামী কর বছরে অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করছি। তবে, আগামী দিনগুলোতে করের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কর আদায় করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে সচেষ্ট থাকব।
আয়করে ছাড় প্রদান
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড়:
সরকার, দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নতির লক্ষ্যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের একটি বড় জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে হ্রাস করে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। বিগত বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
সাধারণ জনগণকে স্বস্তি প্রদানের জন্য অন্যান্য যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উৎসে কর হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে তা এ মহান সংসদের নিকট উপস্থাপন করছি-
স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ;
শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের ব্যবহারের জন্য আমদানিকৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
উৎসে করের উচ্চ হারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের সরবরাহ এখনো অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে বিধায় সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। এই ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক খাতে এনে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে মাত্র ০.৫ শতাংশে হ্রাস;
পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক এবং ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে কর হার ৫ শতাংশ হতে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার;
কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশে হ্রাস;
স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছে থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ৪ শতাংশ হতে ৩ শতাংশে হ্রাস;
রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১.৫ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
রিসাইকেল্ড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামাল-এ করহার ৩ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
বিটিআরসি কর্তৃক প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জ এর ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার;
মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা-খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ হতে ১০ শতাংশে হ্রাস;
শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে অগ্রিম করের সাধারণ হার ৫ শতাংশ হতে ৪ শতাংশে হ্রাস;
বিদেশি বিনিয়োগের স্বার্থে যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ অনিবাসি (non-resident) করদাতাকে পরিশোধ খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১৫ শতাংশ হতে ৭.৫ শতাংশে হ্রাস;
বিমা খাতে রি-ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম বাবদ খরচ কমানোর স্বার্থে অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধিত বীমা প্রিমিয়াম হতে উৎসে কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ হতে ৫ শতাংশে হ্রাস;
শিল্পস্থাপনে বিনিয়োগের ব্যয় (Cost of Fund) কমানোর স্বার্থে বিদেশি ঋণের সুদের উপর উৎসে করের হার ২০ শতাংশ হতে ১০ শতাংশে হ্রাস করার প্রস্তাব করছি;
এই পদক্ষেপগুলো ব্যবসার নগদ প্রবাহ বাড়াবে, ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাবে, উৎপাদন ব্যয় কমাবে ফলস্বরূপ শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে;
উৎসে করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসাবে বিবেচনা করা
এতদিন করযোগ্য আয় কম থাকা সত্ত্বেও উৎসে কর্তিত কর বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হত যা ব্যবসায় পুঁজির সংকট তৈরি করত। সরকার এই বিধান বাতিল করে উৎসে করকে, অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার আন্তর্জাতিক বিধান চালু করছে। এছাড়াও, অতিরিক্ত পরিশোধিত উৎসে কর ফেরত প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে কর ব্যবস্থার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের করনীতি শুধু রাজস্ব সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে নয়; খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্যও ব্যবহৃত হতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা
দেশে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে, দেশিয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্য তেল উৎপাদন ব্যবসার করহার প্রথম ৫ বছরের জন্য সম্পূর্ণ অব্যাহতি এবং পরবর্তী ৩ বছর ৫০% এবং পরবর্তী ২ বছর ২৫% অব্যাহতি দিয়ে ১০ বছরের জন্য সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি:
পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহ প্রদানের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ কর হার প্রস্তাব করছি। একই সাথে সৌরবিদ্যুৎ বিলের উপর ব্যবহারকারীদের (Consumer) সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
সকল ধরনের ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বিআরটিএ তে রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম আয়করের পরিমাণ ২ লাখ টাকা হতে কমিয়ে ইলেকট্রিক গাড়ির ২০০, ৩০০, ৪০০ এবং ৪০০ KW এর বেশি ক্যাপাসিটির ভিত্তিতে যথাক্রমে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার এবং ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি;
এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্মসংস্থান। আমরা করনীতিকে এমনভাবে সাজাতে চাই, যাতে নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা এবং নতুন প্রজন্ম এগিয়ে আসতে পারে।
তরুণ, নারী, প্রতিবন্ধী ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তা প্রদানের জন্য-
বর্তমানে শুধু IT ফ্রিল্যান্সিং এর ওপর কর অব্যাহতি আছে। এই কর অব্যাহতি সুবিধা অন্যান্য সকল প্রকার ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে ফ্রিল্যান্সাররা তাদের আয় বৈধপথে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে উৎসাহিত হবেন।
তরুণদের উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহ যোগাতে সকল ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েশন হতে আয়কে করমুক্ত করার প্রস্তাব করছি;
তারুণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি;
এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার হতে অর্জিত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব করছি;
ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন বা ক্রীড়াক্ষেত্রের স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির বিনিয়োগের ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ হারে ত্বরান্বিত অবচয় (accelerated depreciation) সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি;
করদাতাদের দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক কাজে দান করাকে উৎসাহ প্রদান করতে কর রেয়াত প্রদানের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী সেবা, ক্যান্সার, অটিজম, ডায়াবেটিস, থ্যালাসেমিয়া ও সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত ১১টি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের তালিকা অনুমোদনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমাদের লক্ষ্য করের হার বৃদ্ধি নয় বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ। এই উদ্দেশ্যে কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব করছি। খুচরা বিক্রেতাদের নিকট থেকে সংগৃহীত এ অগ্রিম করের পরিমাণ হবে অতি নগণ্য, প্রতি ১ হাজার টাকায় মাত্র ২ টাকা। তাছাড়া, অগ্রিম সংগৃহীত এ আয়কর করদাতার প্রদেয় করের সাথে সমন্বয় হবে;
স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট, নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট (No- Frills Account) ও বোর্ড কর্তৃক গেজেট দ্বারা টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা হতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত, অন্য যেকোনো ব্যক্তি, ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল করার বিধানের প্রস্তাব করছি;
সেন্ট্রাল ডাটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে এনবিআর এর তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
সেরা করদাতা সম্মাননা পুরস্কার প্রদান
করদাতাদের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে সামাজিকভাবে সম্মানিত করা এবং সকলকে কর প্রদানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ‘সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই নীতিমালার ভিত্তিতে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ২২টি সহ মোট ৬৭ জন করদাতাকে সেরা করদাতার পুরস্কার প্রদান করা হবে।
আমদানি-রপ্তানি শুল্ক-কর
টেকসই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক-কর বিষয়ে প্রণীত প্রস্তাবসমূহ আমি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করছি।
খাতভিত্তিক প্রস্তাবনা
(ক) বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাত
১) বাণিজ্য প্রসার ও বিনিয়োগ আকর্ষণে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (Free Trade Zone) স্থাপনের সুবিধার্থে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কতিপয় বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করছি।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য শুল্ককর ব্যতিরেকে আমদানি করে তা সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে।
২) অফডক ও আইসিডি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিমালা সংশোধন
বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে বেসরকারি অফডক ও আইসিডি পরিচালনার জন্য বিদ্যমান নীতিমালায় বিদেশি মালিকানাধীন শেয়ারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ থাকার বিধান বিলোপ করার প্রস্তাব করছি।
৩) লজিস্টিকস সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে এয়ারকার্গো অপারেটর স্টেশন স্থাপন সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন
বিশ্বের স্বনামধন্য লজিস্টিকস কোম্পানি এবং দেশিয় বেসরকারি খাতকে এয়ারকার্গো ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে এয়ারকার্গো অপারেটরস স্টেশন স্থাপন সংক্রান্ত নতুন একটি বিধিমালা জারির প্রস্তাব করছি। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক হাবে উন্নীত হবে এবং ই-কমার্স খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
৪) বেসরকারি বন্দর এবং টার্মিনাল অপারেটর বিষয়ক বিধিমালা প্রণয়ন
দেশের বন্দর সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং এক্ষেত্রে Greenfield Investment আকর্ষণের লক্ষ্যে বেসরকারি বন্দর এবং টার্মিনাল অপারেটর সংক্রান্ত একটি বিধিমালা জারির প্রস্তাব করছি।
৫) দেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ উৎস সৌর বিদ্যুৎখাতের প্রসারে এই খাত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণসমূহ আমদানিতে প্রযোজ্য
আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূন্য শতাংশ করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তাব করছি।
এই খাতের ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে এই প্রজ্ঞাপনটি ৩০ জুন, ২০৩১ পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করছি।
তবে দেশে এই খাত সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ইত্যাদি পণ্যসমূহের রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন, ২০২৮ খ্রিস্টাব্দের পর প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
৬) দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শুল্ক-কর অব্যাহতি প্রদান
জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel) নির্ভর পরিবহনের বিকল্প হিসেবে দেশে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) উৎপাদনে এবং ইলেকট্রিক গাড়ির যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা প্রদান করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
যেসকল প্রতিষ্ঠান চার চাকা (Four-wheeler) ও তিন চাকার (Three-wheeler) বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের বডি তৈরি, ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং এবং অ্যাসেম্বলিং সম্পন্ন করার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে উচ্চ মূল্য সংযোজন করবে, তাদের ক্ষেত্রে উপকরণ ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত সকল প্রকার শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাব করছি।
অন্যদিকে, যেসকল প্রতিষ্ঠান পার্টস সংযোজন ও পেইন্টিং কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কিছুটা কম মূল্য সংযোজন করবে, তাদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত অন্যান্য সকল প্রকার শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাব করছি।
একইসাথে, স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ভ্যাট এবং অন্য সকল প্রকার শুল্ক-করাদি হতে সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানপূর্বক একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
উপরোক্ত সকল রেয়াতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন, ২০৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
৭) ই-বাইক উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে রেয়াতি সুবিধা বৃদ্ধি
দেশিয় ই-বাইক (Electric-Bike) উৎপাদনকারী ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পার্টস ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে নিয়োজিত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকেও উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
৮) কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে বহাল রাখা
আমদানি-নির্ভর প্রযুক্তি পণ্য যেমন- মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), ওয়াশিং মেশিন, এটিএম (ATM) ও সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদনপূর্বক সাশ্রয়ী মূল্যে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং এখাতে রপ্তানি উৎসাহিতকরণের লক্ষ্যে এ সকল পণ্য উৎপাদনের
কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
৯) কম্পিউটার ও ডিজিটাল পণ্য উৎপাদন শিল্পে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারি
কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস খাতের দেশীয় বিকাশকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে কম্পিউটার (Computer), কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের জন্য উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
১০) দেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি রেয়াতি সুবিধা প্রবর্তন
স্থানীয়ভাবে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এই শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক, সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আগাম কর আগামী ৩০ জুন, ২০৩১ পর্যন্ত অব্যাহতি প্রদান করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তাব করছি।
১১) স্মার্টকার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ১০টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
সরকারের কল্যাণমুখী নাগরিক সুবিধাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হচ্ছে।
এই বিশাল চাহিদাকে সামনে রেখে সব ধরনের স্মার্ট কার্ড ও ব্যাংকিং ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড উৎপাদনে অত্যাবশ্যক ১০টি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি।
১২) জাহাজ ও ড্রেজার শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এই খাতের রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখা
জাহাজ ও ড্রেজার শিল্পের বিকাশ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জাহাজ ও ড্রেজার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
১৩) পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনকারী শিল্পে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি
দেশে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন (Lithium-ion) ব্যাটারির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি (Sodium-ion Battery) এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক (Battery Pack) উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আগামী ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত এসকল পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা প্রদান করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
(খ) ভোগ্য পণ্য
১) শিশুখাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস
আমদানিকৃত শিশু খাদ্য প্রস্তুতমূলক সামগ্রীর (Preparation for Infant or young children) ওপর শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। ফলে দেশের বাজারে শিশুখাদ্যের দাম হ্রাস পেয়ে সাধারণ মানুষের নিকট আরও সুলভ ও সহজলভ্য হবে।
২) সকল মসলা আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার
জনসাধারণের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় এবং দৈনন্দিন রান্নায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের মসলা ব্যবহার করা হয়। এ বিবেচনায় সকল প্রকার মসলার ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
৩) খেজুর আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার
খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
(গ) কৃষিখাত
১) কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার
দেশে স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে কীটনাশক উৎপাদনে রেয়াতি সুবিধা প্রদান সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর পুরোপুরি মওকুফ করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
২) সার উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
স্থানীয়ভাবে জিংক সালফেট সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এর মূল কাঁচামাল জিংক অ্যাশ (Zinc Ash) আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৩) ভেটেরিনারি মেডিসিন আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা বিস্তৃতকরণ
বিভিন্ন ভেটেরিনারি মেডিসিন (Veterinary Medicine) আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যের পরিবর্তে তার জেনেরিক ক্যাটেগরির পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
৪) কাজুবাদাম চাষকে উৎসাহ দিতে আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদান
দেশিয় চাষ ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম (Cashew Nuts in Shell) এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের (Cashew Nuts Shelled) আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ১ শতাংশ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। তবে দেশে উৎপাদকগণ কর্তৃক অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৫) দেশিয় শিল্পের প্রসারে পাঙ্গাস মাছের ফিলেট আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ
দেশিয় মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উপযুক্ত বাজার প্রতিরক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমদানিকৃত পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
৬) পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য (Poultry, Dairy and Fish Feed) উৎপাদনকারী শিল্পের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে তিনটি কাঁচামাল নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করে শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
৭) পোল্ট্রি খাতের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক এই খাতের কতিপয় উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করে আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(ঘ) স্বাস্থ্যখাত
১) চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ (Medical equipments) উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশের স্বার্থে এই শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় কতিপয় কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অন্যকিছু কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করার এবং এই সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন, ২০৩০ পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করছি।
২) কিডনি রোগীদের ব্যবহার্য ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি
দেশের বিপুল সংখ্যক কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়া সচল রাখতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার (Dialysis Filter) একটি সংবেদনশীল ও অপরিহার্য চিকিৎসা সামগ্রী।
বর্তমানে এই চিকিৎসা উপকরণটি আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ করভার থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই, ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আরোপিত বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
এর ফলে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সুবিধার কারণে কিডনি রোগীর প্রতিটি ডায়ালাইসিস বাবদ ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে।
৩) মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত মর্চুয়ারির আমদানি শুল্ক হ্রাস
মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য মর্চুয়ারি (Mortuary) আমদানিতে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক হ্রাস করে ১ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
(ঙ) ওষুধ খাত
১) ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
দেশিয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পকে স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তুলতে বিদ্যমান
রেয়াতি শুল্ক সুবিধার প্রজ্ঞাপনে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে আরও ৯টি উপকরণ যুক্ত করে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
২) Active Pharmaceutical Ingredient (API) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার
ওষুধ শিল্পের অধিকতর প্রসারকল্পে স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদনের লক্ষ্যে এপিআই তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৩) ওষুধ শিল্পের নতুন ১৭টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে নতুন করে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করে আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(চ) জনস্বাস্থ্য খাত
১) সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
ঢাকা ও বিভাগীয় শহরসমূহসহ শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ বাস্তবায়নে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ১ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
২) তামাকজাত পণ্যের আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ
জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর নিকোটিন গ্র্যানুলস (Nicotine granules) এবং নিকোটিন পাউচ (Nicotine Pouches) আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য নতুন কোড সৃজনপূর্বক ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
(ঝ) বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর সহায়ক উপকরণ আমদানিতে শুল্ক রেয়াত সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বাধীন চলাচলের জন্য সহায়ক ২১ ধরনের Special Assistive Device আমদানিতে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এই কর রেয়াত সুবিধা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের Mobility বাড়বে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে এবং পরিবার ও সমাজের ওপর করের বোঝা লাঘব করবে।
(ছ) পরিবহন খাত
১) ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) জনপ্রিয় করতে শুল্ক ছাড়
পরিবেশ দূষণ রোধ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অনুরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান সমুদয় শুল্ক-কর এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক বাস-ট্রাকের ক্ষেত্রে ভ্যাট ব্যতীত সমুদয় শুল্ক-কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এই সুবিধা আগামী ৩০ জুন, ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান মোট করভার ৯৩ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ২৫,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ি ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত গাড়ির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
২) প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (PHEV) আমদানিতে শুল্ক হ্রাস
একই ভাবে, নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (PHEV)-এর ক্ষেত্রে ২০০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতা সম্পন্ন গাড়ি আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক গাড়ির ধরণভেদে হ্রাস করার এবং ১৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন গাড়ি আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
এর ফলে ১৮০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে মোট করভার ৯৩.১৬ শতাংশ হতে হ্রাস হয়ে ৭৩.৪৩৭ শতাংশ হবে এবং ২০০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে মোট করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ হতে হ্রাস পেয়ে ৯৬.১০ শতাংশ হবে।
৩) ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে সকল প্রকার শুল্ককর প্রত্যাহার
ইলেকট্রিক গাড়ির (EV) নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সবচেয়ে জরুরি দেশব্যাপী বিস্তৃত চার্জিং নেটওয়ার্ক। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার এবং চার্জিং স্টেশন (Electric Vehicle Charger or Charging Station) এর জন্য আমদানি পর্যায়ে মোট করভার ৩৯.৭৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৪) জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel) চালিত গাড়ি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ককর বৃদ্ধি
পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ডিজেল, অকটেন বা পেট্রোল চালিত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে এবং পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যান (EV) ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে মধ্যম সারির ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন (IC) ইঞ্জিনবিশিষ্ট আমদানিকৃত গাড়ির ওপর বিদ্যমান সামগ্রিক করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
তবে অন্যান্য গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান করভার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করছি।
(জ) তথ্য-প্রযুক্তি খাত
১) তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে কম্পিউটার সামগ্রীর আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ককর বিশেষভাবে হ্রাস করা
প্রযুক্তি খাতে উন্নত বাংলাদেশ এবং আইটি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ল্যাপটপ, ডেক্সটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি এবং এসএসডি (SSD) আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
২) পয়েন্ট অব সেলস মেশিন
সরকারের ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অনুষঙ্গ পয়েন্ট অব সেলস (Point of Sales) মেশিন আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ এবং ৭.৫ শতাংশ আগাম কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(ঝ) ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি
দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈশ্বিক মানের ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং উচ্চমানের কন্টেন্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাণ সামগ্রী যেন তরুণদের নাগালের মধ্যে থাকে, সেজন্য বাজেটে কতিপয় পণ্যে শুল্ক করাডি কমানোর প্রস্তাব করছি।
ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত সঙ্গীতের মানোন্নয়ন ও ক্রিয়েটিভ মিউজিক তৈরিতে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট—যেমন গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি এবং এদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
এছাড়াও, চলচ্চিত্র ও ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার কারিগরি দিক আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা (Cinematographic Camera) এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(ঞ) শিল্পখাত
স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রতিরক্ষণের লক্ষ্যে নিম্নরূপ প্রস্তাব করছি:
ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রস্তুতকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস (Float Glass) আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
এলপিজি সিলিন্ডার, অটো ট্যাংক, এবং ভাল্ব ও বাঙ্ক (Valve & Bung) উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি ও শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
দেশে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধকল্পে সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স (Synthetic Woven Fabrics) আমদানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা জিপসাম বোর্ড ও শিট উৎপাদনকারী শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে জিপসাম বোর্ড ও শিট আমদানির ওপর ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
পিভিসি রেজিন (PVC Resin) এবং পেট রেজিন (PET Resin) উৎপাদনকারী শিল্পকে যথাযথ প্রতিরক্ষণ প্রদানে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ ফ্রি হুইল (Free Wheel) আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার এবং একই সাথে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফরমার শিল্পকে শক্তিশালী শুল্ক প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে উক্ত ক্ষমতার ট্রান্সফরমার আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার এবং একই সাথে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় ওয়াশিং মেশিন উৎপাদনকারী শিল্পের উপযুক্ত প্রতিরক্ষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সকল প্রকার হাউসহোল্ড টাইপ ওয়াশিং মেশিন আমদানিতে নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
কাগজ শিল্পের স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিরক্ষণের লক্ষ্যে গ্রিজ প্রুফ পেপার (Greaseproof Paper) ও গ্লাসিন পেপার (Glassine Paper) আমদানির ওপর বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার এবং একই সাথে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
রি-ফ্র্যাক্টরি সিমেন্ট (Refractory Cement) শিল্পের সুরক্ষায় এর প্রধান কাঁচামাল বল ক্লে (Ball Clay)-সহ ৫টি কাঁচামাল আমদানিতে আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় মেইজ স্টার্চ (Maize Starch) শিল্পের উপযুক্ত বাজার প্রতিরক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করে এই পণ্যটির আমদানি শুল্ক বিদ্যমান ১৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
দেশিয় ডিটারজেন্ট উৎপাদনকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল লিনিয়ার অ্যালকাইল বেনজিন (Linear Alkyl Benzene) আমদানির ক্ষেত্রে মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক ধার্য করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় কোল্ড-রোল্ড এবং কোটেড কয়েল ও শিট (Cold-Rolled and Coated Coil and Sheet) উৎপাদনকারী শিল্পের প্রতিরক্ষণে কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিট আমদানিতে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
কপার তার ও টিউব উৎপাদনকারী শিল্পের প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে কপারের তার আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি এবং কপার টিউব আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
দেশিয় ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ৫টি কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণপূর্বক রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করছি।
দেশিয় মোটর উৎপাদনকারী শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে ১২০০ ওয়াটের নিম্ন ক্ষমতাসম্পন্ন ডিসি মোটর আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা টায়ার-টিউব উৎপাদনকারী শিল্প খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উক্ত শিল্পের ২টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় স্কিন কেয়ার ও বিউটি প্রোডাক্টস উৎপাদনকারীদের উৎসাহ প্রদানের জন্য এই শিল্পের ২টি কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক হ্রাস করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে কাঁচামাল হিসেবে কফি এক্সট্র্যাক্ট, এসেন্স ও প্রিপারেশন বাল্কে আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
আমদানি বিকল্প পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার উৎপাদন শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদানের উদ্দেশ্যে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (Polyester Staple Fibre) পণ্যটিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
প্রজ্ঞাপন সংশ্লিষ্ট কতিপয় প্রস্তাবনা
১) শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারি
দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতের বহুমুখী সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
২) সেবা খাতকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগাম কর অব্যাহতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্তকরণ
জনকল্যাণমূলক সেবা খাত যেমন হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জনগুরুত্ব বিবেচনায় উৎপাদনকারী শিল্পের ন্যায় সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে আগাম কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার খরচ কমবে।
৩) ইটিপি পরিচালনার জন্য উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ বৃদ্ধি
ইটিপি (Effluent Treatment Plant) পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
৪) বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃক কয়লা আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ বৃদ্ধি
দেশের বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুতের দাম সহনশীল রাখার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃক কয়লা আমদানিতে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ ৩০ জুন, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
বিনিয়োগ-বান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে মূল্য সংযোজন কর খাতে নিম্নরূপ প্রস্তাবসমূহ মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করছি:
ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের টার্নওভার কর প্রদানের সহজ বিধান:
ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সমগ্র দেশে এলাকা ও মার্কেটভিত্তিক ব্যবসার ধরণ ও আর্থিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে Flat Rate এ সীমিত পরিমাণে সুনির্দিষ্ট টার্নওভার কর প্রদানের বিধান করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর পরিশোধ সহজ হবে এবং জনগণ স্বপ্রণোদিত হয়ে গর্বিত করদাতা হিসেবে কর প্রদানে এগিয়ে আসবে।
জুয়েলারি খাতে সুনির্দিষ্ট ভ্যাটের বিধান প্রণয়ন
জুয়েলারি সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরি হিসাবে ২,৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
ব্যাংক স্থিতির ওপর প্রযোজ্য আবগারি শুল্ক হ্রাস:
বর্তমানে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক (Excise Duty) অব্যাহতি রয়েছে। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বস্তি প্রদানের স্বার্থে অব্যাহতির সীমা ৩ (তিন) লক্ষ্য টাকা হতে বৃদ্ধিপূর্বক ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। এছাড়াও, একটি Loan Account এর বিপরীতে শুধুমাত্র একবারই আবগারি শুল্ক কর্তন করার বিধান প্রণয়নের প্রস্তাব করছি।
প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যকে অব্যাহতি প্রদান
দেশের লাখ লাখ তরুণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সৃজনশীল কন্টেন্ট তৈরি করে আয় করছেন, তারা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তরুণ প্রজন্মের উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহ প্রদান এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি প্রদানের জন্য নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করছি:
স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান
স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা আমদানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থান ও স্থাপনা ভাড়া গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। উক্ত অব্যাহতির মেয়াদ ৩০ জুন, ২০৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সার
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সার কর্তৃক প্রদত্ত সেবার উপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
SIM এর উপর সুনির্দিষ্ট কর প্রত্যাহার
আইসিটি can কে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার এ খাতে ট্যাক্স, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং নীতিমালা সংস্কারের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে টেলিকম সেক্টরে করের হার প্রায় ৫০% এবং তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৫%। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ হার অনেক বেশি। তাই এ খাতের বিকাশে সরকার এ ধরণের ট্যাক্স ক্রমান্বয়ে যৌক্তিক হারে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের সাধারণ মানুষের নিকট মোবাইল সেবা আরো সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রতিটি মোবাইল সিমের উপর আরোপিত ৩০০/-টাকা হারে কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি। ফলশ্রুতিতে আগামী অর্থবছরে মোট ১২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হ্রাস হবে।
কৃষি খাতে অব্যাহতি প্রদান
(ক) কৃষি কাজে ব্যবহার্য সকল সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এ কার্যে ব্যবহার্য সকল ধরনের কীটনাশকের আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি।
স্বাস্থ্য খাতে অব্যাহতি প্রদান
(ক) বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় Out of Pocket Expenditure বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। জনসাধারণের চিকিৎসা খরচ কমানোর লক্ষ্যে আমদানিকৃত হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স এর সরবরাহের ক্ষেত্রে জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এর ফলে প্রতিটি হার্টের রিং বা স্টেন্ট এর মূল্য প্রায় ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে। চোখের প্রতিটি ইন্ট্রাওকুলার লেন্স এর মূল্য প্রায় ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে;
(খ) কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার্য Blood Tubing Set for Hemodialysis এর আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এর ফলে কিডনী ডায়ালাইসিস এর খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে।
দেশিয় শিল্প বিকাশের গতিশীলতা আনার স্বার্থে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা পেশ করছি:
(ক) মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে মূসক অব্যাহতি সুবিধা ৩০ জুন, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিতকরণের প্রস্তাব করছি।
(খ) কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার, ইত্যাদি, প্রযুক্তি নির্ভর পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ৩০ জুন, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিতকরণের প্রস্তাব করছি।
(গ) IC (পেট্রোল) ইঞ্জিনের পাশাপাশি হাইব্রিড গাড়ি, প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ি, থ্রি হুইলার ও ফোর হুইলার ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাকের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মূসক অব্যাহতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
(ঘ) মেট্রোরেল সেবার উপর মূসক অব্যাহতির মেয়াদ ৩০ জুন, ২০২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিতকরণের প্রস্তাব করছি।
ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি
BIN বাধ্যতামূলক: ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসায়িক কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে মূসক নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নের প্রস্তাব করছি;
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর তফসিলসমূহে নিম্নোক্ত সংশোধনের প্রস্তাব পেশ করছি:
(ক) বিভিন্ন ধরনের উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করছি।
(খ) বৃক্ষ অথবা বৃক্ষের অংশ এবং সুগন্ধ বৃক্ষ নির্যাস এর আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করছি।
(গ) বিভিন্ন ধরনের এম.এস প্রোডাক্ট (রড) এর উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’ কিছুটা বৃদ্ধির প্রস্তাব করছি।
তামাক করঃ রাজস্ব সম্ভাবনা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির সর্বোচ্চ সমন্বয়
তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে নিম্নরূপ প্রস্তাব করছি:
(ক) সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য নিম্নস্তরের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা ৬২ টাকা, মধ্যম স্তর ৯২ টাকা, উচ্চ স্তর ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তর ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করছি;
(খ) Nicotine Pouch এবং Heated Tobacco এর উপর নিম্নবর্ণিত হারে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করছি:
(গ) অবৈধ তামাক পণ্যের বাণিজ্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে তামাক পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড় মনিটরিং করার জন্যে ‘Track and Trace’ পদ্ধতি প্রণয়নের প্রস্তাব করছি।
অষ্টম অধ্যায়
বিনিয়ন্ত্রণকরণ (Deregulation)-এর মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণ
আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকারে ব্যবসায় সহায়ক পরিবেশ উন্নয়নে বিনিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবাকে সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করা। আমরা বিনিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। সেগুলো আমি এখানে একে একে উপস্থাপন করছি।
বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসা শুরু সহজীকরণের উদ্যোগ
বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসা শুরু সহজ করতে আমরা কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছি, যেমন-
ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার সময়, ব্যয় ও অনিশ্চয়তা কমাতে অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক Single Window ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আবেদন দাখিল হতে শুরু করে লাইসেন্স প্রদানের সকল প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
প্রতিটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা মতামত, নাদাবি, অনাপত্তি বা ছাড়পত্র না দিলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্মতি আছে ধরে নিয়ে আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কোম্পানি নিবন্ধন সেবার ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের ওয়ার্ক পারমিট ৭ দিনের মধ্যে এবং বিনিয়োগকারী ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভিসা ১০ দিনের মধ্যে প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীর আইনি সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে Plug and Play শিল্প-সুবিধা প্যাকেজ চালু করা হবে, যাতে দ্রুত কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন শুরু করা যায়।
বিদেশি কর্মীর নিরাপত্তা ছাড়পত্রের আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া পৃথকভাবে অনলাইনভিত্তিক ও নির্দিষ্ট সময়সীমার আওতায় আনা হবে।
ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে আমরা আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট ব্যবস্থা সংস্কারে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছি, যেমন-
আয়কর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়ন্ত্রণ
ব্যক্তি করদাতাদের পাশাপাশি আগামী অর্থবছরে কোম্পানি করদাতাদের কর্পোরেট রিটার্ন অনলাইনে দাখিলের ব্যবস্থা করা হবে;
করদাতারা সারা বছরব্যাপী রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন, বছরের শুরুর দিকে রিটার্ন দাখিল করলে কর প্রণোদনা পাবেন।
করদাতার উৎসে কর নিরূপিত করের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরত পাবেন; এ রিফান্ড হবে Automated ও Faceless;
আয়কর এবং ভ্যাট অডিটের ক্ষেত্রে Risk Based Selection Criterion এর ভিত্তিতে ব্যক্তি হস্তক্ষেপ ছাড়াই (Without Human Intervention) সম্পূর্ণ অটোমেটেড পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হচ্ছে।
দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির প্রয়োজনীয় দলিলের ভিত্তিতে National Single Window সিস্টেমের মাধ্যমে অটোমেটেড পদ্ধতিতে অনলাইনে বিদেশী বিনিয়োগকারীগণের Tax Residency সার্টিফিকেট প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
Asycuda World এবং eReturn সিস্টেমের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করা হয়েছে।
উৎসে কর কর্তন না করার কারণে করদাতার দাবিকৃত খরচ অনুমোদন না করার বিদ্যমান বিধান বাতিল করার প্রস্তাব করছি;
ব্যবসা খাতের আয় পরিগণনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে Accrual ভিত্তিতে সুদ ব্যয় অনুমোদনের বিধান করার প্রস্তাব করছি;
করদাতাগণের কর দায় হ্রাসকল্পে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কতিপয় আবশ্যিক খরচ যেমন, পারকুইজিট, আপ্যায়ন ব্যয়, ফ্রি স্যাম্পল বাবদ খরচ এবং প্রচারণামূলক খরচ অনুমোদনের সীমা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করছি।
কাস্টমস সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়ন্ত্রণ
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে প্রথম তৈরি পোশাক খাতে কাস্টমস বন্ড প্রথা এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি’র ভিত্তিতে শুল্ক মুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানি ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এ খাতের পাশাপাশি অন্যান্য সকল রপ্তানিমুখী খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্যও কাস্টমস বন্ড সুবিধা চালুর প্রস্তাব করছি।
ব্যবসা সহজীকরণের উদ্দেশ্যে শতকরা একশত ভাগ রপ্তানিমুখী Compliant পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিবছর বন্ডের অডিটের বাধ্যবাধকতা রহিত করার প্রস্তাব করছি।
তৈরি পোশাক শিল্পের ন্যায় শতভাগ রপ্তানিমুখী লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং টাওয়েল, লিনেন ও হোমটেক্সটাইল শিল্প প্রতিষ্ঠানের জেনারেল বন্ডের মেয়াদ এক বছরের স্থলে তিন বছর করার প্রস্তাব করছি।
বন্ডেড ওয়্যারহাউসে এককালীন কাঁচামাল মজুদের সীমা তুলে দেয়ার প্রস্তাব করছি। বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণের মেয়াদোত্তীর্ণের অন্যুন ৪৮ ঘণ্টা পূর্বে ইউটিলাইজেশন পারমিশন বা ইউপি (UP) গ্রহণের পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টা পূর্বে করার প্রস্তাব করছি।
জুয়েলারি শিল্পের আধুনিকায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানি এবং তা হতে প্রস্তুতকৃত জুয়েলারি রপ্তানি কার্যক্রম সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে বন্ডেড ওয়্যারহাউস পদ্ধতির আওতায় একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার ও রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্রায়নের জন্য নতুন ১০টি খাতে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্ক মুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
কেবলমাত্র ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০% মূল্য সংযোজন (Value Addition) করার আইনি বাধ্যবাধকতা বিলোপ করার প্রস্তাব করছি।
Authorized Economic Operator (AEO) প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক System Based Self-Assessment পদ্ধতিতে পণ্য খালাসের হার বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করছি।
আমদানি পণ্য ছাড়করণের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্যের সঠিকতা ও গুণগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ল্যাবের পাশাপাশি বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড ও আইএসও (ISO) স্বীকৃত বেসরকারি ল্যাবরেটরিতেও পণ্য পরীক্ষার সুযোগ রেখে নতুন বিধান করার প্রস্তাব করছি।
মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়ন্ত্রণ (Deregulation)
মূসক রিফান্ড আবেদন গ্রহণ, যাচাই, অনুমোদন এবং মূসক ফেরতের অর্থ iBAS++ এর মাধ্যমে করদাতা ব্যাংক হিসাবে জমা ইত্যাদি অটোমেটেড প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে।
আগামী অর্থবছরের শুরু থেকে আয়করের eReturn এর ন্যায় eVAT সিস্টেম হতে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হবে।
ক্ষুদ্র ভ্যাটদাতাদের জন্য সহজে মূসক দাখিলপত্র দাখিলের সুবিধার্থে আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম প্রবর্তন করা হবে যাতে তারা অতি সহজে অল্প কিছু তথ্য পূরণ করে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে পারেন।
eVAT সিস্টেমে আবেদন করার সাথে সাথেই, তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায় শনাক্তকরণ সংখ্যা (বিআইএন) প্রদান করার লক্ষ্যে আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নের প্রস্তাব করছি।
প্রতিমাসে রিটার্ন দাখিলে বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারপূর্বক প্রতি তিন মাসে একবার অর্থাৎ ত্রৈমাসিকভাব রিটার্ন দাখিলের বিধান প্রণয়নের প্রস্তাব করছি।
যে সকল করদাতা নিজস্ব ERP software ব্যবহার করেন, তারা যাতে নিজস্ব সফটওয়্যার হতে এক ক্লিকেই ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আপিল, ট্রাইব্যুনাল এবং হাইকোর্টে আপীল দায়েরের ক্ষেত্রে জমাকৃত কর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করা এবং এ ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাগণের Discretionary Power বিলোপ করার প্রস্তাব করছি।
অর্থ প্রত্যাবাসন, বৈদেশিক লেনদেন ও আর্থিক লেনদেন সহজীকরণে উদ্যোগ
বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেন সহজীকরণ, ব্যাংকিং সেবা দ্রুততর করা এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে আমরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছি:
অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর ও মূলধন প্রত্যাবাসন সহজ করা হয়েছে। এক কোটি টাকা পর্যন্ত valuation report লাগবে না এবং ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত deal value বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই repatriation করা যাবে।
বড় অঙ্কের লেনদেনে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণকে আরও নিরপেক্ষ করতে licensed valuation firms ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হবে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমাতে নির্ভরযোগ্য আমদানিকারক ও কম-ঝুঁকির পণ্যের ক্ষেত্রে ঋণপত্রের বাধ্যতামূলক ব্যবহার ধাপে ধাপে শিথিল করার বিষয় বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর Real Time Gross Settlement-এর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে ব্যাংক, মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সেবামাধ্যমের মধ্যে লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
e-Loan চালুর মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ১২ মাস মেয়াদে দেয়া যাবে। এতে ক্ষুদ্র ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে।
খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিতে মামলা দায়েরের আগে Pre-Suit Mediation বা মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। এতে ঋণসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে।
পুঁজিবাজারে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণে পদক্ষেপ
পুঁজিবাজারকে আরও গভীর, স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছি:
ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সহজ করতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদন ও পরিপালন-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা কমানো হচ্ছে।
আইপিও প্রক্রিয়া সময়নির্ধারিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। আবেদন দাখিল, আনুষঙ্গিক দলিলাদি, যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন ও অনুমোদনের ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে।
ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করা হবে।
পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান, Asset Management Company (AMC), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে।
কর্পোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে।
সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিলসহ বিভিন্ন financing instruments-এর ব্যবহার বাড়ানো হবে।
বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল, ব্যাংক, ব্রোকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্যব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার করা হবে।
দেশিয় কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে regional dual listing-এর সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
নিরীক্ষক, মূল্যায়নকারী, issue manager সহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের professional liability framework এবং liability insurance প্রবর্তন করা হবে।
পুঁজিবাজারে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় (Sattlement Time) বর্তমানের T+2 থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে T+0 করা হবে।
নির্মাণ, পরিবেশ, স্থানীয় অনুমোদন ও প্রতিপালন সহজীকরণে উদ্যোগ
শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি সেবাসমূহ সহজ ও সমন্বিত করতে আমরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছি: শিল্পকারখানার স্থান নির্বাচনসংক্রান্ত ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন অনলাইনে গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নবম অধ্যায়: উপসংহার
আমি মহান জাতীয় সংসদের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, দেশের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, প্রবাসী এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা কামনা করছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারাবাহিক পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ এবং জাতীয় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হবে।
আমাদের প্রত্যয় এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সুযোগের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, উদ্যোগ ও উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে যাবে।


