২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ এবং ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং বিদ্যমান করকাঠামো বিবেচনায় সরকার যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন শেষে জাতীয় সংসদ ভবনের জেনারেল এম এ জি ওসমানী গেটের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান সরকার, প্রশাসন এবং কর ব্যবস্থার পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, বাজেটে শুরুতেই ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত রাজস্ব আদায় করতে ব্যর্থ হলে সেই ঘাটতি আরও বড় আকার ধারণ করবে। তখন সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে বাধ্য হতে হবে।
নাহিদ ইসলাম আরও, এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির হার অন্তত ৪২ শতাংশ হতে হবে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এমনকি অতীতের সেই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড পুনরাবৃত্তি হলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাবে। ফলে সরকার কীভাবে সেই অর্থের সংস্থান করবে, সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
সরকার এটিকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে তুলে ধরলেও নাহিদ ইসলাম বলেন, এটি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেটে পরিণত হতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ঋণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দুর্বল ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার যদি আরও বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়বে। এতে বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নাহিদ ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দেশি-বিদেশি ঋণের চাপ বাড়ার পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতিও আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তার মতে, বাজেট বক্তব্য শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত মৌলিক পরিবর্তন আনার সক্ষমতা এই বাজেটের নেই।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টিও তুলে ধরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ অভিযোগ করেন, সরকার এখনো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হলে তার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি স্বস্তিদায়ক। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কিছুটা উপকারে আসতে পারে। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্যের ওপর কর কমানোর প্রস্তাবও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা। তার মতে, কর কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দ্রব্যমূল্য কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা এবং সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপরই শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

