ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো প্রভাবশালী দুই নাম খুব কমই এসেছে। দুই তারকার ক্লাব ক্যারিয়ার ট্রফি, গোল এবং ব্যক্তিগত অর্জনে ভরপুর। তবে বিশ্বকাপ মঞ্চে তাদের গল্প দীর্ঘ সময় ধরে ছিল অপূর্ণতার গল্প।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে সেই অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দেন মেসি। আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়ে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্জন পূরণ করেন। অন্যদিকে রোনালদো এখনও বিশ্বকাপ ট্রফির অপেক্ষায়। ২০২৬ বিশ্বকাপে দুজনই খেলছেন নিজেদের ষষ্ঠ আসরে, যা সম্ভবত তাদের শেষ বিশ্বকাপ।
তাদের এই দীর্ঘ পথচলায় বিভিন্ন সময়ে কিছু দল স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়েছে। কখনো নকআউটে, কখনো ফাইনালে, আবার কখনো গ্রুপ পর্বেই থেমে গেছে বিশ্বকাপ অভিযান।
২০০৬: প্রথম বিশ্বকাপে হতাশার শুরু
জার্মানি বিশ্বকাপ ছিল মেসি ও রোনালদো—দুজনেরই অভিষেক আসর। তখনও তারা ভবিষ্যতের তারকা, বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া বাকি।
কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয় দক্ষিণ আমেরিকার দলটিকে। তরুণ মেসি সেই ম্যাচে বেঞ্চে বসেই বিদায়ের দৃশ্য দেখেছিলেন।
অন্যদিকে পর্তুগাল সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তবে জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের বিপক্ষে হেরে ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে যায় রোনালদোদের।
২০১০: আবারও জার্মানির সামনে মেসি
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে আর্জেন্টিনা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়। পুরো টুর্নামেন্টে গোলশূন্য ছিলেন মেসি। ফলে জার্মানি তার জন্য এক বড় দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
রোনালদোর পর্তুগালও খুব বেশি দূর যেতে পারেনি। শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় তারা। পরবর্তীতে সেই স্পেনই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
২০১৪: শিরোপার সবচেয়ে কাছাকাছি মেসি
ব্রাজিল বিশ্বকাপ ছিল মেসির সবচেয়ে আবেগঘন অভিযান। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ বাধা হয়ে দাঁড়ায় আবারও জার্মানি।
মারাকানার ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের একমাত্র গোলে শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা। মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেলেও বিশ্বকাপ ট্রফি অধরাই থেকে যায়।
অন্যদিকে পর্তুগালের জন্য ২০১৪ ছিল হতাশাজনক। গ্রুপ পর্বেই তাদের যাত্রা শেষ হয়ে যায়। জার্মানির কাছে বড় ব্যবধানে হার এবং অন্য ম্যাচগুলোর ফল মিলিয়ে নকআউটে ওঠা সম্ভব হয়নি।
২০১৮: একই দিনে বিদায়
রাশিয়া বিশ্বকাপে মেসি ও রোনালদো—দুজনই শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ৪-৩ গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। কিলিয়ান এমবাপ্পের দুরন্ত গতির সামনে অসহায় ছিল তাদের রক্ষণভাগ। পরে ফ্রান্সই শিরোপা জেতে।
একই দিনে পর্তুগালও উরুগুয়ের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হয়। এডিনসন কাভানির জোড়া গোল রোনালদোদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ করে দেয়।
২০২২: মেসির স্বপ্নপূরণ, রোনালদোর কান্না
কাতার বিশ্বকাপ মেসির জন্য ছিল পরিপূর্ণতার গল্প। সৌদি আরবের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু করলেও আর্জেন্টিনা দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় তারা। অবশেষে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিরোপা নিজের করে নেন মেসি।
রোনালদোর জন্য অবশ্য গল্পটা ছিল ভিন্ন। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। ম্যাচ শেষে চোখের জল লুকাতে পারেননি তিনি। মরক্কো হয়ে ওঠে তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের অন্যতম বেদনাদায়ক প্রতিপক্ষ।
কারা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে?
মেসির বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ নিঃসন্দেহে জার্মানি। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪—তিনটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথ রুদ্ধ করেছে দলটি।
রোনালদোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো একক প্রতিপক্ষ নেই। তবে স্পেন, উরুগুয়ে ও মরক্কো তার বিশ্বকাপ স্বপ্নে বড় আঘাত হেনেছে বিভিন্ন সময়ে।
২০২৬: কি দেখা যাবে মহারণ?
২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো সম্ভাব্য মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা কখনো একে অপরের মুখোমুখি হননি।
৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে নকআউট পর্বের পথ অনেকটাই ভিন্ন। গ্রুপপর্বের ফলাফল ও নকআউট ব্র্যাকেটের সমীকরণ মিললে ইতিহাসের অন্যতম প্রতীক্ষিত সেই লড়াই দেখা যেতে পারে।
তবে তার আগে দুজনের সামনে রয়েছে নিজ নিজ দলের লক্ষ্য পূরণের চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা, আর রোনালদোর পর্তুগাল খুঁজছে সেই একমাত্র বড় ট্রফি, যা এখনও তার ক্যারিয়ারে অনুপস্থিত।
২০০৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত নানা দল তাদের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ২০২৬ সালে ইতিহাস নতুন কোনো গল্প লেখে, নাকি আবারও কোনো প্রতিপক্ষ শেষ করে দেয় তাদের বিশ্বকাপ অধ্যায়।
পড়ুন: বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর্জেন্টিনা শিবিরে দুঃসংবাদ
আর/


