নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে ৯ শতাংশের ঘর ছাড়ানো মূল্যস্ফীতিকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই লক্ষ্য অর্জন মোটেও সহজ হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সম্প্রসারণমূলক বাজেট গ্রহণের ফলে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়লেও যদি উৎপাদন ও সরবরাহ সেই অনুযায়ী বৃদ্ধি না পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কাক্সিক্ষত হারে কমানো সম্ভব হবে না। তাই বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকির বিষয়। এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়বে।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণে সংশোধিত বাজেটে সেটি বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। এতে ক্রয়ক্ষমতা কমে বেশ চাপে আছে মানুষ। এমন বাস্তবতায় নতুন অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। এ জন্য চাল, গম, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, আদাসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী,
আলোচ্য পণ্যগুলোর বিদ্যমান উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে করের চাপ কমে খুচরা বাজারে দাম কমবে বলে আশা করছে সরকার। সেই সঙ্গে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু করছাড় যথেষ্ট নয়; বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলও কার্যকর করতে হবে। দেশে অনেক সময় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ভালো হলেও মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমে না। বাজেটে এসব বিষয়ে তুলনামূলক কম সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখা গেছে। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরের জন্য মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বড় অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রণোদনা অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়াতে এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও বেশ উচ্চাভিলাষী। যদি প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হয়, তাহলে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে গেছে। এর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ধরনের জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। যার প্রভাব দ্রব্যমূল্য ও জীবনমানে পড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজম্যান্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্য অর্জন বেশ কঠিন হবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র এক বছরের মধ্যে তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তার মতে, এবারের বাজেট মূলত সম্প্রসারণমূলক প্রকৃতির। সরকার উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ ও চাহিদা উভয়ই বাড়বে। সাধারণত চাহিদা বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মূল শর্ত হবে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে নীতি সহায়তার পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন না হলেও এর কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার ভাষায়, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য অর্জন না হলেও কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, মুদ্রানীতিকে আরও সংকোচন করার সুযোগ এখন খুব সীমিত। কারণ বাজেট সম্প্রসারণের কারণে মুদ্রানীতিও কিছুটা সম্প্রসারণ করতে হবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকির ওপর জোর দিতে হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, অনেক কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক যে দাম পান, ভোক্তা পর্যায়ে সেই পণ্যের দাম তার কয়েক গুণ বেশি হয়ে যায়। উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যকার এই দীর্ঘ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রণোদনার অর্থ যদি উৎপাদনমুখী খাতে যায়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়াবে না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি এবং উৎপাদন খাতে এই অর্থ ব্যবহার হলে সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে। তবে অ-উৎপাদনশীল খাতে অর্থ প্রবাহিত হলে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না।
পড়ুন:বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার বিনিয়োগ হাব: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দেখুন:আঙুরে আঙুল ফুলে কলাগাছ!
ইমি/


