মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে তেলের দাম এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই ইতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চুক্তিটি কতদিন টিকবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম ইসরায়েল। কারণ চুক্তি নিয়ে দেশটির অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। শুধু ইসরায়েল সরকারই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী কয়েকটি ইহুদি সংগঠনও এর বিরোধিতা করছে। যদিও রিপাবলিকান ঘরানার ইহুদি সংগঠনগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়েছে।
লেবানন ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা
ওয়াশিংটনের আপত্তি সত্ত্বেও লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে ইসরাইল। এতে ১৮ জন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ওই ঘটনার জেরে সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। পরে তেল আবিবের প্রতি কঠোর বার্তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইসরায়েল। তবে এই যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটেনি। কারণ অতীতেও যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি।
চুক্তিতে স্বস্তি পেল বিশ্ব অর্থনীতি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিও স্বস্তি পেয়েছে।
চুক্তির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। যদিও লেবানন পরিস্থিতি ও সুইজারল্যান্ডে আলোচনা স্থগিত হওয়ার কারণে শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছিল, তবে সমঝোতার ঘোষণার পর তা প্রায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমে যায়।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং জ্বালানি সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জনঅসন্তোষও বাড়ছিল। উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছিল। ফলে এই সমঝোতা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক স্বস্তিও বয়ে এনেছে।
সমালোচনার মুখেও ট্রাম্প
চুক্তি নিয়ে বিরোধিতা অবশ্য থেমে নেই। সমালোচকদের অভিযোগ, ইরানের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল।
এ বিষয়ে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হচ্ছে না। এটি ভুয়া সংবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আছে শুধু সাফল্য, কম তেলের দাম এবং বিজয়।”
তবে ব্যাখ্যা সত্ত্বেও রিপাবলিকান শিবিরের একাংশ অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ মন্তব্য করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চায় তাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা কখনোই ভালো সিদ্ধান্ত নয়। একই সুরে রক্ষণশীল বিশ্লেষক টাকার কার্লসন এই সমঝোতাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অপমানজনক পরাজয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইরানের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি
তেহরানের জন্য এই সমঝোতা শুধু যুদ্ধবিরতির বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্যের দাবিও করার সুযোগ এনে দিয়েছে।
শুরু থেকেই ইরানের লক্ষ্য ছিল না যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলকে সামরিকভাবে পরাজিত করা। বরং সংঘাত থেকে এমন অবস্থায় বেরিয়ে আসা, যাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো অক্ষত থাকে, নেতৃত্ব কার্যকর থাকে এবং দরকষাকষির অবস্থান পুরোপুরি নষ্ট না হয়।
সমঝোতা স্মারকটি ইরানকে সেই দাবির সুযোগ দিয়েছে। এতে সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, অবরোধ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনা এবং পুনর্গঠন তহবিলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের জোরালো তাগিদের কারণেই তারা আলোচনায় সম্মত হয়েছেন। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারাও এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
কেন বাড়ছে ইসরায়েলের উদ্বেগ
ইসরায়েলে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ইরান-সম্পর্কিত সম্ভাব্য চুক্তিতে ট্রাম্প ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করবেন—এমন বিশ্বাস করেন না ৭১ শতাংশ ইসরাইলি। মাত্র ১৩ শতাংশ তার প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৫২ শতাংশ মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান ইসরায়েলের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ইসরায়েলপন্থি বিভিন্ন সংগঠন ও থিংক ট্যাংকের প্রধান উদ্বেগ হলো—চুক্তিটি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধিনিষেধ নেই।
এ কারণে একাধিক প্রভাবশালী ইহুদি সংগঠন এবং কট্টরপন্থি নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান সমঝোতার সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান জিউইশ কোয়ালিশন ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে এই উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের কঠোর বার্তা
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে ইসরাইলকে সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রই তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী মিত্র।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলে লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। শান্তি আলোচনার মধ্যেই সামরিক অভিযান চালানোকে ওয়াশিংটন ভালোভাবে নেয়নি।
মার্কিন চাপের পরই হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরায়েল। উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি বজায় থাকবে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে তেল আবিব।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধবিরতি এবং সমঝোতা সত্ত্বেও শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনাও আপাতত স্থগিত হয়েছে।
বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের। তার সফর স্থগিত হওয়া এবং বৈঠক পিছিয়ে যাওয়ায় চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
ফলে আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে স্বস্তির বাতাস বইলেও সেই শান্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় এখনও কাটেনি। আর সেই সংশয়ের কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েল-ইরান বৈরিতার পুরোনো সমীকরণ।
পড়ুন: বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ফের ব্রাজিলের দখলে
আর/


