ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নে শান্তি আলোচনার প্রথম পর্বে অংশ নিতে সুইজারল্যান্ড সফর করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এই সফরকে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ডে গিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তার সফর স্থগিত করা হয়। ফলে আলোচনা প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে এবং সেই দায়িত্ব পান ট্রাম্পের বিশেষ দূত উইটকফ।
লেবানন পরিস্থিতি আলোচনার পথে বড় বাধা
শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। কারণ তেহরান শুরু থেকেই শর্ত দিয়েছিল, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের উদ্যোগ থাকতে হবে।
তবে শুক্রবার ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঘোষণা দেয়। এর পরপরই সুইজারল্যান্ডে মার্কিন দূতের সফরের বিষয়টি সামনে আসে। ফলে আলোচনার পথে থাকা অন্যতম বড় বাধা আপাতত দূর হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সম্ভাব্য একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে প্রথম দফার আলোচনায় অংশ নিতেই সুইজারল্যান্ডে গেছেন স্টিভ উইটকফ।
এর মাত্র এক দিন আগে সফর স্থগিত করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় ওই পরিস্থিতিতে আলোচনায় বসতে অনাগ্রহী ছিলেন তিনি।
ইসরায়েলকে ট্রাম্পের বার্তা
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটির এক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে উল্লেখ করেন, ট্রাম্প ইসরায়েলকে বলেছেন—কখনো কখনো শান্ত থাকতে হয় এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি
দিনব্যাপী সংঘর্ষের পর স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় এবং ইরানের সহায়তায় এ সমঝোতা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র এবং ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সমঝোতা স্মারকের পর নতুন অধ্যায়
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এর পর দুই দেশের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে প্রতিনিধিদের আলোচনায় বসার পরিকল্পনা করা হয়।
তবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। একদিনে অন্তত ৪৭ জন নিহত হওয়ার খবর আসে। এমনকি যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও কিছু এলাকায় হামলার অভিযোগ উঠেছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকেরা শুরু থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গড়ে ওঠা সমঝোতা ইসরায়েলের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। বিশেষ করে দেশটির কট্টরপন্থি ইহুদিবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ফলে যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি অনিশ্চয়তামুক্ত নয়। তবে উইটকফের সুইজারল্যান্ড সফর এবং আলোচনার সূচনা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় বিশ্বে স্বস্তি, তবে শঙ্কার নাম ইসরায়েল
আর/


