বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের দুই কিংবদন্তি শিল্পী রামেন্দু মজুমদার ও ফেরদৌসী মজুমদার আবারও প্রমাণ করলেন, শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য সব সময় জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চসজ্জা বা নাটকীয় উপস্থাপনার প্রয়োজন হয় না। কেবল কণ্ঠ, অনুভূতি ও স্মৃতির শক্তিতেই দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করা যায়। সেই অভিজ্ঞতাই মিলেছে ‘থিয়েটার’-এর প্রযোজনা ‘লাভ লেটার্স’ নাটকে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় নাটকটি। শুরু থেকেই দর্শকদের মনোযোগ আটকে রাখে এর ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলী। মঞ্চে পাশাপাশি বসে থাকা দুই চরিত্রের চিঠি পাঠের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় তাদের দীর্ঘ জীবনের গল্প, সম্পর্কের বিবর্তন এবং না বলা অনুভূতির এক আবেগঘন জগৎ।
নাটকে অনন্ত শাহেদ চৌধুরী চরিত্রে অভিনয় করেন রামেন্দু মজুমদার। সংযত অথচ গভীর অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি চরিত্রটির শৈশব, কৈশোর, পরিণত বয়স এবং বার্ধক্যের নানা আবেগকে তুলে ধরেন। কেবল কণ্ঠের ওঠানামা এবং সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির মাধ্যমে তিনি চরিত্রটির মানসিক পরিবর্তন ও নীরব ভালোবাসাকে জীবন্ত করে তোলেন।
অন্যদিকে মাইশা ইসলাম চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার ছিলেন প্রাণবন্ত ও আবেগময়। শৈশবের চঞ্চলতা থেকে শুরু করে শিল্পীজীবনের সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং জীবনের শেষপ্রান্তের উপলব্ধি—প্রতিটি স্তর তিনি সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ও সংলাপ উপস্থাপন চরিত্রটির সময়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্পকেও স্পষ্ট করে তোলে।
মূলত দুই ভিন্ন মানসিকতার মানুষের দীর্ঘ জীবনের চিঠি বিনিময়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে নাটকের কাহিনি। সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের রূপ বদলেছে, জীবনের বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু চিঠিগুলোর ভেতরে জমে থাকা অনুভূতি কখনও হারিয়ে যায়নি। সেই অনুভূতির ধারাবাহিকতাই নাটকের মূল শক্তি।
নাটকের বিভিন্ন পর্যায়ে বেজে ওঠা ঘণ্টাধ্বনি সময়ের প্রবাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দর্শক অনন্ত ও মাইশার জীবনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করেন—কলেজজীবন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন, কর্মজীবন, মধ্যবয়সের বাস্তবতা এবং আত্ম-উপলব্ধির গভীর মুহূর্তগুলো।
তবে ‘লাভ লেটার্স’ শুধু একটি নাটক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের এক আবেগঘন ইতিহাসও। ২০১৭ সালে অধ্যাপক আবদুস সেলিম নাটকটির বাংলা রূপান্তর পাঠ করেন প্রয়াত অভিনেতা আলী যাকেরের বাসভবনে। সে সময় ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। পরিকল্পনা ছিল, কম শারীরিক পরিশ্রমে আবারও মঞ্চে ফিরবেন আলী যাকের এবং তাঁর বিপরীতে অভিনয় করবেন ফেরদৌসী মজুমদার।
মার্কিন নাট্যকার এ. আর. গার্নির বিখ্যাত নাটকটি সেই লক্ষ্যেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আলী যাকেরের অসুস্থতার কারণে পরিকল্পনা বারবার পিছিয়ে যায়। একসময় তিনি সহশিল্পীদের বলেছিলেন, “আপনারা শুরু করুন, আমি পরে যোগ দেব।” কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান আর হয়নি। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ফলে ‘লাভ লেটার্স’ নাটকটি হয়ে ওঠে তাঁর স্মৃতির প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ত্রপা মজুমদারের নির্দেশনায় নির্মিত এই প্রযোজনায় মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা করেছেন পলাশ হেন্ড্রি সেন, পোশাক পরিকল্পনায় ছিলেন গুলশান আরা মুন্নী এবং মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় ছিলেন সামিয়া মহসীন। উল্লেখ্য, ‘লাভ লেটার্স’ প্রথম মঞ্চস্থ হয় ২০২৩ সালের ৫ মে। এরপরও নাটকটি দর্শকদের আবেগ ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
পড়ুন:বগুড়ার বিতর্কিত দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
দেখুন:ব্রাজিলের হেক্সা মিশন ঘিরে ভক্তদের উল্লাস
ইমি/


