দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেতরে নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের চত্বরে থাকা তিনটি বড় গাছ স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেনের মৌখিক নির্দেশে কাটা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এই গাছ কাটার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা বনবিভাগ—কোনো পক্ষই কিছুই জানে না বলে দাবি করেছে। সরকারি সম্পদ কাটার ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, তা পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) দুপুরে সরেজমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, চত্বরে থাকা পুরনো ও হেলে পড়া একটি জাম, একটি আকাশমনি ও একটি ভেটুল গাছ কাটার কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি গাড়ি ভর্তি গাছ ইতিমধ্যেই স্থানীয় ‘গোলাপ’ নামের এক ব্যক্তির করাতকলে (স’মিল) নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং বাকি অংশগুলো পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাছ কাটতে হলে উপজেলা প্রশাসন, বনবিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লিখিত অনুমোদন ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। কিন্তু এই ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জর্জ মিত্র চাকমা বলেন, ”গাছ কাটার বিষয়টি সম্পর্কে আমি একেবারেই অবগত নই। এ ব্যাপারে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি এবং আমি কাউকে গাছ কাটার কোনো অনুমতিও দিইনি। বিষয়টি এখন গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
হাকিমপুর থানার ওসি জাকির হোসেন গাছ কাটার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, “উপজেলার মাসিক সভায় হাসপাতালের ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। যেহেতু তিনি পৌরসভার দুটি ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছেন, তাই তিনি গাছ কাটার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের গাছ কাটতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।”
সহকারী পুলিশ সুপার (হাকিমপুর-ঘোড়াঘাট সার্কেল) আ. ন. ম. নিয়ামত উল্লাহ
ওসির এই ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সরকারি গাছ কাটার নির্দেশ দেওয়ার কোনো আইনি এখতিয়ার একজন ওসির নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম রসূল রাখি জানান, “হাসপাতালের গাছ কাটার বিষয়টি আমার জানা নেই। সরকারি গাছ কর্তনের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন রয়েছে, যা অমান্য করার সুযোগ নেই। একজন ওসি কেন গাছ কাটার নির্দেশ দেবেন, সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ তানভীর হাসনাত রবিন জানান, “গাছ তিনটি ঝড়ে হেলে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। বিষয়টি মাসিক সমন্বয় সভায় তোলা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ওসির নির্দেশেই গাছগুলো কাটা হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন।”
হাকিমপুর উপজেলা বনবিভাগের বিট কর্মকর্তা শাজাহাজান আলী এবং বিরামপুর রেঞ্জের বন কর্মকর্তা আনোয়ারুল হোসেন উভয়েই জানান, গাছ কাটার বিষয়ে বনবিভাগকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি বা অবহিত করা হয়নি।
হাকিমপুর পৌরসভার প্রকৌশলী হাবিব আহমেদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কোনো এখতিয়ার পৌরসভার নেই এবং এ বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।
অনুমতি ছাড়া এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি গাছ কেটে স’মিলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে কি না এবং এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

