বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলার ধস: খুন-অপহরণে আতঙ্কিত পটিয়া

উপজেলায় একের পর এক খুন, অপহরণ, ছিনতাই, চুরি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও জমিজমা সংক্রান্ত সহিংস ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। গত প্রায় দুই বছরে সংঘটিত একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও সাম্প্রতিক অপরাধমূলক ঘটনায় উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেলেও অনেক ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও পূর্বশত্রুতার জেরে পটিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৮টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর হাইদগাঁও কাজীপাড়া এলাকায় ভাতিজার হাতে রাশেদ নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। ৩ ডিসেম্বর হাইদগাঁও ফইজ্জারপুল এলাকায় রাজীব দাশের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। একই মাসে পৌরসদরের গিরিচৌধুরী বাজার এলাকায় আব্দুল আজিজ নামে এক ব্যক্তি ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ১০ ডিসেম্বর হাবিলাসদ্বীপে নির্মাণাধীন সুইচ গেটের দারোয়ান বদিউল আলমকে হত্যা করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর জঙ্গলখাইন এলাকায় গৃহবধূ শিউলী বেগম হত্যার শিকার হন। ৩০ ডিসেম্বর হাইদগাঁও মাহাদাবাদ ভাঙারপুল এলাকায় জমি বিরোধের জেরে কৃষক শামসুল আলমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল ছনহরা গ্রামের নূরুল ইসলামকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা তার মরদেহ ক্ষেতের জমিতে ফেলে যায়। ৩০ মে পৌরসভার মাঝেরঘাটায় নূরুল হক জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে নিহত হন। ১৭ জুন মাইক্রোবাস চালক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের রক্তাক্ত মরদেহ ইন্দ্রপুল সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গাপাড়া এলাকায় ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে ওমানপ্রবাসী মোহাম্মদ মামুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২০২৬ সালেও হত্যাকাণ্ডের ধারা অব্যাহত রয়েছে। মার্চে ছনহরা ইউনিয়নের মধ্যম চাটারা এলাকায় জমি বিরোধের জেরে আহত মাহাবুব আলম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এপ্রিলে দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার ব্যবসায়ী আবুল কাশেম সওদাগর হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ৯ জুন কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন পংকজ শীল। এ ঘটনায় আহত হন তিলক চক্রবর্তী। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।

সর্বশেষ আলোচিত ঘটনা শিশু জায়হান হত্যা। ১৬ জুন নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন পর দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার একটি ময়লার ভাগাড় থেকে তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তের পর পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ দাবি করেছে, ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে।

শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, চলতি জুন মাসে পটিয়ায় আরও কয়েকটি অপরাধমূলক ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ২ জুন ভাটিখাইন ইউনিয়নের ঠেঁগরপুনি খাল থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৬ জুন জিরি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাইদাইর এলাকায় দেলোয়ার হোসেন রুবেল নামে এক যুবককে কুপিয়ে জখম করা হয়। ৯ জুন পটিয়া প্রেস ক্লাবে ঢুকে একদল যুবক সাংবাদিক আবেদুজ্জামান আমিরীর ওপর হামলা চালায়। একই রাতে পোস্ট অফিস এলাকার মকবুল শাহ (রহ.) মাজারের দানবাক্স ভেঙে টাকা চুরির ঘটনা ঘটে।

এছাড়া ১৬ জুন কুসুমপুরা ইউনিয়নে প্রবাসী সিরাজুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সর্বশেষ গত বুধবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের গৈড়লার টেক এলাকায় ছিনতাইকারীদের হামলায় এক ভিডিওগ্রাফারসহ দুই ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরাধ দমনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব খোরশেদ আলম বলেন, ” সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার অনেকগুলোই পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে সংঘটিত হয়েছে। তবে অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অপরাধ দমনে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। পংকজ শীল হত্যা ও শিশু জায়হান হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য ঘটনাগুলোর তদন্তও চলমান রয়েছে।”

তবে সচেতন মহলের মতে, অপরাধ দমনে আরও জোরালো অভিযান, নিয়মিত টহল বৃদ্ধি এবং কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

পড়ুন- ইলিয়াস আলীকে গুম করেছিলেন জিয়াউল আহসান

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন