বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত এবং কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চীন সফর করবেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফর এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গন্তব্য হিসেবে তিনি চীনকে বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশি গণমাধ্যমগুলোর ধারণা, সফরকালে ১৫টিরও বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে, যার মধ্যে বড় অবকাঠামো ও শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোগও রয়েছে।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও চীন পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগও ধারাবাহিকভাবে বজায় রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীন টানা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধাও প্রদান করেছে বেইজিং।
অবকাঠামো উন্নয়নেও দুই দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে অবদান রেখেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে দুই দেশের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে সম্পর্ক আরও গভীর করার পথে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং চীন সম্পর্কে বিভিন্ন মহলের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি। নিবন্ধে বলা হয়, কিছু আন্তর্জাতিক শক্তি চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে এবং ‘ঋণের ফাঁদ’ তত্ত্বসহ নানা ব্যাখ্যা সামনে আনছে।
এছাড়া বাংলাদেশের কিছু অংশ পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রতি বেশি আস্থাশীল হওয়ায় চীনের উন্নয়নপথ ও শিল্প সহযোগিতা নিয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে। আবার অন্য একটি অংশ চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবিধা স্বীকার করলেও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকে।
গ্লোবাল টাইমসের মতে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে আরও খোলামেলা সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর দুই দেশের মধ্যে শিল্প খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে নতুন গতি আনতে পারে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করা হলে রপ্তানিমুখী শিল্প আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পাশাপাশি গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এ সফর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো এবং চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুশাসন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেতে পারে বলেও মত দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধের উপসংহারে বলা হয়েছে, উন্নয়নের কোনো একক মডেল নেই। নিজস্ব বাস্তবতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে পূর্ব ও পশ্চিমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সফর সেই যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পড়ুন: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্ল্যানারি সেশনে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
আর/


