দেশে দ্বিতীয়বারের মতো প্রদান করা হলো ‘ফেমিনিস্ট গ্রিন অ্যাকশন অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’। নারীবাদী সবুজ জলবায়ু রূপান্তর এবং টেকসই অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনটি প্রতিষ্ঠান ও দুজন তৃণমূল উদ্যোক্তাকে এই পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করেছে একশনএইড বাংলাদেশ।
রাজধানীর একটি হোটেলে বুধবার (২৪ জুন) রাতে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিজয়ীদের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এবারের পুরস্কার মূলত ‘ইয়ুথ-লেড গ্রিন এন্টারপ্রেনারশিপ’ (যুব নেতৃত্বাধীন সবুজ ব্যবসা) এবং ‘এসএমই’ (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা) – এই দুই বিভাগে প্রদান করা হয়। ‘ইয়ুথ-লেড গ্রিন এন্টারপ্রেনারশিপ’ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান – ‘স্বচ্ছ’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড লিংকআপ’। অন্যদিকে, ‘এসএমই’ বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেছে ‘ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস বিডি লিমিটেড’।
পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘স্বচ্ছ’ পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার; ‘ওয়ার্ল্ড লিংকআপ’ যুবকদের সম্পৃক্ত করে জলবায়ু সচেতনতা ও সবুজ প্রযুক্তির প্রসার এবং ‘ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস বিডি লিমিটেড’ স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প তৈরির মাধ্যমে টেকসই অর্থনীতিতে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার লাভ করেছে।
পুরস্কারের পাশাপাশি সমাজে টেকসই পরিবেশ ও কর্মসংস্থানে বিশেষ অবদানের জন্য এ বছর দুজনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। তারা হলেন—বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা শারমিন আক্তার এবং ঠাকুরগাঁওয়ের সৌরবিদ্যুৎ-ভিত্তিক উদ্যোক্তা সোলেমান আলী। শারমিন আক্তার উচ্ছিষ্ট কাপড় ও সুতা থেকে দড়ি তৈরি করে ২ শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ। অন্যদিকে, ‘সোলার ম্যান’ খ্যাত সোলেমান আলী তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে কৃষকদের সেচকাজে স্বল্প খরচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মডেল তৈরি করেছেন। তাঁর এই ‘ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র’ মডেলটি বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে স্থানীয় কৃষকদের সেচকাজে দারুণ স্বস্তি এনে দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং পুরো অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির। তিনি বলেন, ‘ন্যায্য ও নারীবাদী রূপান্তরে এসএমই এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি দিতে আমাদের এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। আমরা বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগ একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
জলবায়ু ও পরিবেশের টেকসই রূপান্তরের সাথে মানুষের মানসিকতা ও সংস্কৃতির যোগসূত্রটি তুলে ধরে তিনি দেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপসের মানসিকতা এবং আইনের শাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে ‘স্পটলাইট স্পিকার’ হিসেবে প্রকৃতি, নারী ও মানুষের দায়বদ্ধতার আলোকে বক্তব্য রাখেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য অভিনেতা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও সমাজকর্মী আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে নারীবাদী ভাবি কি না, তা বড় কথা নয়; তবে আমি বিশ্বাস করি এই পৃথিবীটা মূলত নারীদের কাছ থেকে পাওয়া অনুভবের পাঠশালা। প্রকৃতি যেভাবে সবকিছুকে লালন করে, নারীরাও ঠিক সেভাবেই সমাজ ও জীবনকে আগলে রাখে।’
নাট্যচার্য সেলিম আল দীনের একটি নাটকের সংলাপ স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকাটা বড় কথা নয়, কীভাবে বেঁচে আছি সেটাই বড়। জলবায়ুর এই লড়াইয়ে আমাদের শুধু একা বেঁচে থাকার অহংকার করলে চলবে না। তেলের মতো পানির ওপর ভেসে না থেকে, আমাদের পানির মতো হতে হবে—যার গৌরব অন্যকে ধারণ করার বা ভাসিয়ে রাখার মধ্যে।’
আরেকজন ‘স্পটলাইট স্পিকার’ বিশিষ্ট করপোরেট আইনজীবী ও ব্যবসায়ী নেতা ব্যারিস্টার নিহাদ কবির আইন, করপোরেট পরিবেশ ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘করপোরেট সেক্টরে সাসটেইনেবিলিটি বা ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে কাগজে-কলমে অনেক বড় বড় আইন থাকলেই পরিবেশ বা সমাজ বদলায় না, যদি না মানুষের ভেতরের চিন্তাভাবনা বা মূল্যবোধের রূপান্তর ঘটে।’
নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা রোধে প্রাতিষ্ঠানিক আইনের চেয়ে পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চাকে বড় উল্লেখ করে তিনি বলেন, টেকসই অর্থনীতির লক্ষ্যে তরুণদের ও যুবসমাজকে পরিবেশ সুরক্ষার লড়াইয়ে যুক্ত করতে হলে শুধু আইনি কড়াকড়ি নয়, বরং জীবনের গল্প ও আড্ডার ছলে তাদের উদ্বুদ্ধ করা বেশি কার্যকর।
এ বছর পুরস্কারের জন্য অনলাইনে মোট ২৭টি আবেদন জমা পড়ে। এরপর বিচারকদের নিবিড় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ীদের নির্বাচিত করা হয়। এবারের বিচারক প্যানেলে ছিলেন সাপোর্ট-এর কান্ট্রি ম্যানেজার সুরাইয়া আক্তার, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া টি. আহমেদ, বিশিষ্ট স্থপতি ও বিল্ড বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফরহাদুর রেজা, একশনএইড ইন্টারন্যাশনালের আইএইচএআরটি (IHART)-এর গ্লোবাল রেজিলিয়েন্স অ্যাডভাইজার তানজির হোসেন এবং একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির।
পুরস্কার বিতরণী শেষে ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সংগীতশিল্পী ও কালচারাল অ্যাক্টিভিস্ট ওয়ার্দা আশরাফ জলবায়ু পরিবর্তন, নারী অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সংগ্রামের গল্প নিয়ে দেশি-বিদেশি গানের এক অনবদ্য পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানটি শেষ হয় সমাপনী বক্তব্য ও নৈশভোজের মধ্য দিয়ে।
উল্লেখ্য, নারীবাদী সবুজ জলবায়ু রূপান্তরে অবদান রাখা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি ও উৎসাহিত করতে একশনএইড বাংলাদেশের আয়োজনে গত বছর (২০২৫) সালে যাত্রা শুরু করে ‘ফেমিনিস্ট গ্রিন অ্যাকশন অ্যাওয়ার্ড’। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছরও দেশের তৃণমূল উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন স্বতন্ত্র ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার ও বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হলো।


