যুক্তরাষ্ট্রের টানা দ্বিতীয় দফার বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করলে ‘পৃথিবীতে ইরান নামের কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকবে না’। এরই মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের আটটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। এতে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৭ জুন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই হলেও পরবর্তী পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে সর্বশেষ হামলা চালানো হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ধারাবাহিক হামলার জবাব হিসেবেই এই সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযানে ইরানের সামরিক নজরদারি অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং মাইন স্থাপনের সক্ষমতাসংক্রান্ত স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বন্দরের কাছে তাহরুই গ্রামের আশপাশে একাধিক বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে আল জাজিরা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কেশম দ্বীপেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগের দিনও একই এলাকায় মার্কিন হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য তেহরান দায়ী এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে। যদিও উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ করে আসছে।
ট্রাম্প তার পোস্টে বলেন, ইরান যদি বর্তমান অবস্থান থেকে সরে না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শুরু করা সামরিক অভিযান শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর মন্তব্যও করেন তিনি।
এর আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘কিকু’ একটি অজ্ঞাত প্রক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এতে কোনো নাবিক আহত হননি এবং জাহাজে থাকা তেলেরও ক্ষতি হয়নি।
সেন্টকমের দাবি, ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল বহনকারী ট্যাঙ্কারটি আত্মঘাতী ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট মেরিনট্রাফিক ডটকম জানিয়েছে, ট্যাঙ্কারটি আল শাহীন তেলক্ষেত্র থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এবং রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল।
প্থিবীতে ইরানের অস্তিত্ব থাকবে না: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ‘দোজখের অভিজ্ঞতা’ দেওয়ার পাল্টা হুমকি দিয়ে কুয়েত ও বাহরাইনে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করলে এই পৃথিবীতে ইরান নামক রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার জের ধরে শনিবার (২৭ জুন) রাতে ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনীর টানা দ্বিতীয়বার বোমাবর্ষণের পর এই চরম যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, ‘এটি অত্যন্ত সম্ভব যে তারা (ইরান) কখনোই শিক্ষা নেবে না। এমন একটি সময় আসতে পারে যখন আমরা আর যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে পারব না এবং আমরা অত্যন্ত সফলভাবে যে সামরিক কাজটি শুরু করেছিলাম তা সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে বাধ্য হব।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে দুই দেশের এই নতুন সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান শান্তি আলোচনাকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দেওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটিকে চূড়ান্ত পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
আমেরিকার যুদ্ধবিমান থেকে চালানো বোমাবর্ষণের জবাবে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-এর নৌ শাখার প্রধান ওয়াশিংটনকে এক চরম হুঁশিয়ারি বার্তা পাঠিয়েছেন।
তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আগামী দিনগুলোতে এক ভয়াবহ দোজখের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে। ইরানি নৌ কমান্ডারের মতে হরমুজ প্রণালির উপকূলবর্তী সিরিক বন্দরে মার্কিন বাহিনীর চালানো অন্ধ আক্রমণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত রহস্যের কোনো সমাধান করতে পারবে না, বরং জলপথের নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের ওপর ইরানের নিখুঁত আঘাত অন্যান্য জাহাজগুলোকে যাতায়াতের শর্তগুলো মনে করিয়ে দেবে।
রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে যে তারা ইতিমধ্যে কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনের পোর্ট সালমান নামক স্থানে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের প্রধান কার্যালয় লক্ষ্য করে জোরালো হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী তাদের এই অভিযানে মার্কিন বাহিনীর আটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যেকোনো অজুহাতে শত্রুর যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা ছোটখাটো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের জবাবেও তারা এমন এক বিধ্বংসী ও চরম প্রতিরোধমূলক উত্তর প্রদান করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ৮ মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার দাবি আইআরজিসির
ইরানের সিরিক শহর ও কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত অন্তত আটটি মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা অভিযান চালানোর দাবি করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সংস্থাটির দাবি, স্থানীয় সময় শনিবার দিবাগত রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে নৌ ও মহাকাশ বাহিনীর সমন্বয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের সালমান বন্দরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরসহ মোট আটটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আইআরজিসির দাবি, হামলায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, এর আগে একই দিনে ইরানের পাঁচটি উপকূলীয় চৌকিতে মার্কিন হামলার পরই পাল্টা এই সামরিক অভিযান চালানো হয়।
বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগও আনা হয়েছে। আইআরজিসির ভাষ্য, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালিতে তাদের নৌবাহিনীর একটি অনুপ্রবেশকারী জাহাজের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপকূলীয় চৌকিগুলোতে হামলা চালানোর দাবি করেছে।
আইআরজিসি আরও উল্লেখ করেছে, সম্প্রতি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী সামুদ্রিক নৌযান তদারকির দায়িত্ব ইরানের ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
বিবৃতিতে ভবিষ্যতের জন্যও কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ম লঙ্ঘনকারী যেকোনো নৌযানের বিরুদ্ধে আগের চেয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো আগ্রাসন চালানো হলে তার জবাব আরও কঠোর ও বিধ্বংসী হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাহিনীটি।
এর আগে ইরানের উপকূলীয় কয়েকটি চৌকিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার দাবি ওঠে। এরপরই মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি জানায় আইআরজিসি।
পড়ুন: আবার মেসির গোল, আবার বিশ্বরেকর্ড
আর/


