বিজ্ঞাপন

একটি প্রজন্মের শৈশবের জাদুকর: মুস্তাফা মনোয়ার

বাংলাদেশের চিত্রকলা, পাপেটশিল্প ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের অন্যতম পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন) সকালে তার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের কাছে তার নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ এবং সেই অনুষ্ঠানের দুই প্রিয় চরিত্র পারুলবাউল

বিজ্ঞাপন

সাদাকালো টেলিভিশনের যুগে শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষার অনন্য মাধ্যম হয়ে উঠেছিল ‘মনের কথা’। পারুল ও বাউলের প্রাণবন্ত কথোপকথন, বাউলের হাতে একতারা, মাঝেমধ্যে গরুর ‘হাম্বা’ ডাক—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি শিশুদের কাছে ছিল অন্যরকম আকর্ষণের কেন্দ্র। সময়ের ব্যবধানে প্রজন্ম বদলালেও সেই স্মৃতি আজও অনেকের হৃদয়ে অমলিন। মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। অনেকে ‘মনের কথা’-এর পুরোনো ভিডিওতে মন্তব্য করে তার আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।

মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক পাপেটশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত। টেলিভিশনের মাধ্যমে পাপেটকে জনপ্রিয় করে তোলার কৃতিত্বও অনেকটাই তার। পুতুলের মাধ্যমে গল্প বলা, শিক্ষা ও বিনোদনের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি শিশুদের মনে কৌতূহল ও সৃজনশীলতার বীজ বপন করেছিলেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেটশিল্প নিয়ে কাজ করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য অনুসারী ও গুণগ্রাহী।

চারুকলায় পড়াশোনা করলেও পেশাজীবনে তিনি টেলিভিশনকে বেছে নেন। চিত্রকলা, অনুষ্ঠান পরিচালনা ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি পাপেটশিল্পই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় ক্ষেত্র। কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি পাপেট নিয়ে গভীরভাবে কাজ শুরু করেন। শৈশবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ তাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিল। সেই অনুপ্রেরণাকেই আধুনিক রূপ দিয়ে তিনি বাংলাদেশে কাহিনিনির্ভর পাপেট প্রদর্শনের নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করেন।

তার সৃষ্টি ‘পারুল’ চরিত্রটির নাম নেওয়া হয়েছিল বাংলার লোককাহিনি ‘সাত ভাই চম্পা’ থেকে। আনন্দময় শিক্ষার অংশ হিসেবে শিশুদের কাছে সহজ ভাষায় বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিতেই তিনি এই চরিত্রকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন। পারুল ও বাউলের যুগলবন্দি একসময় দেশের কোটি শিশুর প্রিয় হয়ে ওঠে।

মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটশিল্প দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়। নিজের পাপেট দল এবং বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ‘ধনমিয়া’কে নিয়ে তিনি মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেন। সেখানে তার পরিবেশনা দর্শক ও সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। শিল্পকর্মে বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য।

তার পাপেটযাত্রার সূচনা আরও আগে। ১৯৬০-৬১ সালের দিকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কলিম শরাফীর একটি প্রামাণ্যচিত্রে প্রথম তার পাপেট অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রের মাধ্যমে তিনি পাপেট প্রদর্শনী করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে এসব পাপেট নাটকের মাধ্যমে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী পাকিস্তানি শাসকদের মনোভাবকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হতো, যা সে সময় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

মুস্তাফা মনোয়ারের পারিবারিক ঐতিহ্যও ছিল সমৃদ্ধ। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা ও জমিলা খাতুন দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীকালে দেশের গণমাধ্যম, শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন হারাল এক বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল মানুষকে। তবে তার সৃষ্টি পারুল, বাউল এবং ‘মনের কথা’ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে। শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো এই গুণী শিল্পীর অবদান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পড়ুন:কোক স্টুডিও’র গান ‘মেঘ’

দেখুন:এনসিপি যাদের সাথে জোট করেছে তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না: মির্জা ফখরুল |

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন