ইসলামি শিক্ষাকে শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় উন্নয়ন, নৈতিকতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের মূলধারায় নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, ইসলামি শিক্ষার মূল লক্ষ্য মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। এ খাতকে যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে গবেষণা, দক্ষ শিক্ষক এবং আধুনিক কারিকুলামের কোনো বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ফাজিল ও কামিল স্তরের ‘শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান ও অনন্য শিক্ষার্থীদের অ্যাওয়ার্ড প্রদান’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষাকেও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ও বাস্তবমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষাকে শুধু প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে এখানকার শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও গবেষণানির্ভর, পরিকল্পিত ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, অতীতে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত, আধুনিক এবং কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। ফাজিল ও কামিল শিক্ষাকে দেশের মূলধারার উচ্চশিক্ষার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করার বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনুভূত হচ্ছে। ইসলামি শিক্ষা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম। শিক্ষার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মাদ্রাসা খাতে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের অনেক মাদ্রাসায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। বিশেষ করে ইসলামি বিষয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক পাওয়া বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং কারিকুলাম উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নবনিয়োগপ্রাপ্ত কিছু মাদ্রাসা শিক্ষকের বেতনসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ভবিষ্যতে শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, শুধু সনদ অর্জন করাই শিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না। জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। ইসলামি শিক্ষার শিক্ষার্থীদেরও দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, গবেষণা, বিচারব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে অবদান রাখার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, বিসিএস এবং অন্যান্য জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ অতীতেও নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হবে, যাতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরও কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ ছিদ্দিকী, ট্রেজারার শাহীনুল ইসলাম, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ফাজিল ও কামিল স্তরের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান ও অনন্য শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।


