বিজ্ঞাপন

ক্যান্সার রোগী থেকে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী—সবার পাশে দাড়ালেন ডিসি জাহিদ

কেউ বাবাকে বাঁচাতে এসেছেন। কেউ নিজের ক্যান্সারের চিকিৎসা চালিয়ে নিতে। কেউ বার্ধক্যের ওষুধ কেনার সামর্থ্য হারিয়ে শেষ আশ্রয় খুঁজছেন। আবার কেউ এসেছেন শুধু একটি স্বপ্ন বাঁচাতে—বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার জন্য। হাতে একটি আবেদনপত্র। চোখে অনিশ্চয়তা। কণ্ঠে অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

বিজ্ঞাপন

বুধবার ( ১ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এমনই এক মানবিক দৃশ্যের সাক্ষী হন উপস্থিত সবাই। একে একে সবার কথা শোনেন সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কোথাও তাড়াহুড়া নয়, কোথাও বিরক্তি নয়। প্রতিটি আবেদনকারীর পারিবারিক অবস্থা, রোগব্যাধি, আর্থিক সংকট ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তিনি। পরে মানবিক বিবেচনায় তাঁদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

রাঙ্গুনিয়ার জাফর আহমদের কণ্ঠে ছিল জীবিকার সংগ্রামের গল্প। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে চিকিৎসাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শেষ ভরসা হিসেবে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। পূর্ব মাদারবাড়ীর পিংকি হিজড়ার লড়াই আরও কঠিন। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত তিনি। অর্থের অভাবে চিকিৎসা প্রায় বন্ধ। চিকিৎসার কাগজপত্র হাতে নিয়ে যখন তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন, তখন পুরো কক্ষজুড়ে নেমে আসে নীরবতা।

বাঁশখালীর বৃদ্ধা মর্জিয়া বেগমের বয়সের ভারের সঙ্গে যোগ হয়েছে রোগের বোঝা। অন্যদিকে হাসিনা বেগমের নেই স্বামী, নেই সন্তান। মানুষের বাসায় কাজ করেও প্রতিদিনের খাবার জোটে না। শ্বাসকষ্ট ও ডায়াবেটিসের ওষুধ কেনাও তাঁর কাছে বিলাসিতা।


লোহাগাড়ার এক গণমাধ্যমকর্মী নিজের জন্য নয়, বাবার জীবন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে হাজির হন। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব।
ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মী রিতা দাশের চোখে তখন শুধু বাবাকে হারানোর ভয়। একসময় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে পরিচিত রতন দাশ এখন হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ও কোলন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন। প্রতিদিনের ওষুধের খরচই কয়েক হাজার টাকা। মেয়ের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা আর সম্ভব হচ্ছিল না।

স্বামীহারা আনোয়ারা বেগম তিন মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চিত জীবন পার করছেন। মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁইও নেই। এর মধ্যেই পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ—দ্রুত অস্ত্রোপচার। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই অপারেশনও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সেলিম ভূঁইয়ার আবেদন। সাত বছর ধরে অসুস্থ বাবা। একমাত্র উপার্জনকারী দিনমজুর বড় ভাই। অনেক দিন তিনবেলা খাবারও জোটে না। তবুও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। সেই স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, সেজন্য শিক্ষাবৃত্তি সহায়তা চান জেলা প্রশাসকের কাছে।

আবেদনকারীদের কথা শুনে মানবিক ডিসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “একটি আবেদনপত্রের পেছনে থাকে একটি পরিবারের বেদনা। কেউ চিকিৎসার জন্য আসে, কেউ সন্তানের পড়াশোনা বাঁচাতে আসে, কেউ শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে সাহায্য চায়। মানুষের এই আস্থার জায়গাটিকে মর্যাদা দেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি নীতিমালার আলোকে প্রকৃত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। মানুষের কষ্ট মন দিয়ে শোনা এবং সম্ভব হলে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া—এটিও জনসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

প্রতিটি আবেদন হয়তো প্রশাসনিক নথি হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু সেই আবেদনগুলোর ভেতরে ছিল একজন বাবার জীবন বাঁচানোর আর্তি, একজন মায়ের চিকিৎসার আকুতি, একজন বৃদ্ধার বেঁচে থাকার লড়াই এবং একজন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন।


সেদিন জেলা প্রশাসকের কক্ষে শুধু আবেদনপত্র জমা পড়েনি—জমা পড়েছিল মানুষের শেষ ভরসা। আর সেই ভরসার জবাব মিলেছিল সহমর্মিতা আর মানবিকতার হাত বাড়িয়ে।

পড়ুন: সশস্ত্র বাহিনীর ১৫০ কর্মকর্তাকে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত সরকারের

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন