ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপসা। শনিবার (৪ জুলাই) খুলনা মহানগরীর শের-এ-বাংলা রোডের একটি সম্মেলন কক্ষে সেই পর্যবেক্ষণের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
রূপসার নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ ফলাফল অনুযায়ী দেখা যায় যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহ সাধারণভাবে বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোটে শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণে দলিত, জাতিগত, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য জাতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ, সমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিরাপদ নির্বাচনী সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে চলমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনে সমান ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২৬ সালের বাংলাদেশ নির্বাচন প্রকল্পে ”সিভিক রাইটস অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অবজারভেশন” উদ্যোগের অংশ হিসেবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বারা অর্থায়িত এবং ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (ইপিডি) দ্বারা সমর্থিত, রূপসা ২৫টি সংসদীয় আসনের ৫০৯টি ভোটকেন্দ্রে ২০০ জন প্রশিক্ষিত নাগরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে। এই পর্যবেক্ষণ প্রাক-নির্বাচন, নির্বাচন দিবস এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব এবং নিরাপত্তা মূল্যায়ন করেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল এবং প্রক্রিয়াগতভাবে সুশৃঙ্খল ছিল। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র সময়মতো খোলা হয়েছে, নির্বাচনী সামগ্রী যথাযথভাবে সরবরাহ করা হয়েছে এবং ভোটাররা উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পেরেছেন। তবে এই প্রশাসনিক সাফল্য সত্ত্বেও, ফলাফলগুলো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী অংশগ্রহণ এবং বাস্তব অর্থবহ গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে বিদ্যমান স্থায়ী ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করে।
পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে প্রধান উদ্বেগটি চিহ্নিত হয়েছে তা হলো গণভোট প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণের সীমিত মাত্রা। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে।
রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল বলেন, অনেক সংখ্যালঘু ভোটার জানান যে তারা ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর পরই গণভোট সম্পর্কিত বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারেন, যা ভোটার শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা কার্যক্রমে চলমান ঘাটতির প্রতিফলন।
পর্যবেক্ষণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচনী প্রার্থিতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অব্যাহত অপ্রতিনিধিত্বও উঠে এসেছে। ৩০০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী ৫৭টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৪ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচিত চারজনই একই রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত ছিল -৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০ জন নারী ছিলেন।
যদিও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, পর্যবেক্ষণে এমন কিছু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে যা ভোটারদের আস্থা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পর্যবেক্ষণকৃত প্রায় ১১.৬ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে হয়রানি, চাপ প্রয়োগ বা ভোটার চলাচলে সীমাবদ্ধতার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশে, সম্ভাব্য নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধের আশঙ্কায় স্থানীয় জনগণ রাজনৈতিক কার্যক্রমে প্রকাশ্যে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন।
ফলাফলগুলো বিবেচনায় নিয়ে রূপসা ইলেকশন অবজারভেশন টিম মন্তব্য করে:
২০২৬ সালের নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অর্জন করা সম্ভব। তবে যে বিষয়টি এখনও অধরা রয়ে গেছে তা হলো প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভোট দিতে পারে, কিন্তু তারা সবসময় সমান, তথ্যভিত্তিক বা সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে পারে না। এই ব্যবধান দূর করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের জরুরি ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
পর্যবেক্ষণ ফলাফলের ভিত্তিতে রূপসা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী অংশগ্রহণ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং ৮টি সুপারিশসমূহ প্রদান করে।
পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল, হেড অব ফাইন্যান্স ফিরোজা খানম, প্রকল্প পরিচালক শেখ মোস্তাফিজুর রহমান, প্রোগ্রাম অফিসার মো: রবিউল সিকদার, খাদিজা আক্তার, সহকারী প্রোগ্রাম অফিসার পূজারিনি বিশ্বাস, মো: সাফায়েত হোসেন।
পড়ুন:চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সড়ক দুর্ঘটনায় ভ্যান চালকের মৃত্যু
দেখুন:কঠিন জয়ের পর থামছে না আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বাঁধভাঙা উল্লাস
ইমি


