দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমম্বয় কমিটির সহ-সভাপতি, বাংলা একাডেমির সভাপতি, সৎ সাহসী, সত্যবাদী, নির্ভীক, নির্মোহ ও নিবেদিত দেশপ্রেমিক, দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর।
আজ রোববার মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরে খেতে গিয়েছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি ট। পরে সেখানকার একটি হাসপাতালে দুপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৬ বছর।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম ও মা জাহানারা খাতুন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ ও নীলিমা ইব্রাহিমের মতো বিদগ্ধ শিক্ষকের সংস্পর্শে এসে প্রগতিশীল চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করেছেন। এ সময় তিনি শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন চিন্তাবিদ ও পথপ্রদর্শক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলা বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন এবং ১৯৮২ সাল থেকে ‘লোকায়ত’ নামক প্রগতিশীল সাময়িকপত্র সম্পাদনা করে আসছিলেন।
তিনি একুশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪), রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ করেছেন বার্ন্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ এবং নবযুগের প্রত্যাশায়’। এ ছাড়া ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের দুই সন্তান অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারি ছিলেন।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। ছেলে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ, হতাশ এই বাবা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয়পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’
এটি সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় বিচার ব্যবস্থা নিয়ে। ফলে আবুল কাসেম ফজলুল হক শুধু একজন লেখক বা অধ্যাপক নন; তিনি ছিলেন এক প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, যিনি সাধারণ মানুষের মুক্তি ও সমাজের অগ্রগতি নিয়ে ভাবতেন। তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণা ও সম্পাদনা বাংলাদেশের চিন্তা জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি সমকালীন সমাজে প্রগতির আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন।
সোমবার (৬ জুলাই) বাদ ফজর মিরপুরের পল্লবীর মসজিদুল আমান মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অধ্যাপক আবুল কাসেমের লাশ যথাক্রমে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা বাংলা একাডেমি, বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা শহীদ মিনার এবং দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত অপরাজেয় বাংলায় রাখা হবে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

