লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বুড়িরহাটে অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্যে চরম বিপাকে পড়েছেন নতুন ইজারাদার। প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য হাটটি ইজারা নিলেও, হাটের নির্ধারিত জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থায়ী স্থাপনা, মুরগির খামার ও দোকানপাট। এতে বাধ্য হয়ে অন্যের জায়গা ভাড়া নিয়ে হাট পরিচালনা করতে হচ্ছে ইজারাদারকে। অন্যদিকে, হাটের ড্রেন ও উন্মুক্ত স্থানে কসাইখানার বর্জ্য ফেলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আশপাশের বসতবাড়ির বাসিন্দারা। বারবার অভিযোগ করেও মিলছে না কোনো প্রতিকার।
প্রতিবছর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ থেকে পরবর্তী বছরের চৈত্র মাস পর্যন্ত হাটটি ইজারা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের পহেলা বৈশাখে ১৩ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোট ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য হাটটির ইজারা পান সাইফুজ্জামান ফারুক।
দায়িত্ব বুঝে নিতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, হাটের কাঁচাবাজার, গরুর হাট, মুরগির বাজার ও সাইকেলের হাটের জন্য নির্ধারিত জায়গা বেদখল হয়ে আছে। সেখানে স্থায়ী দালান, মুরগির খামার, টিনশেড ঘর এমনকি বর্জ্য নিষ্কাশনের ড্রেনের ওপরও অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন একশ্রেণির দখলদার। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সরকারি এই হাটের জায়গায় অবৈধ ঘর নির্মাণ করে লাখ লাখ টাকা জামানত নিয়ে সেগুলো আবার ভাড়াও দিয়েছেন দখলদাররা। বাধ্য হয়ে ইজারাদারকে বর্তমানে অন্যের জায়গা ভাড়া নিয়ে বাজার পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে হাটের বর্তমান বেহাল দশার চিত্র এবং ১০টি সুনির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা গেছে- ড্রেনেজ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের অভাব।জলাবদ্ধতা নিরসনে মাটি ভরাটের প্রয়োজনীয়তা। ইজারাদারের বসার ঘরের জরাজীর্ণ অবস্থা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য টয়লেট ও প্রস্রাবখানা না থাকা। বিশুদ্ধ পানি পানের জন্য টিউবওয়েলের অভাব। হাটের প্রবেশদ্বারের বেহাল রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার। শেডঘর নির্মাণ ও তার সংস্কার।কাঁচাবাজার ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গার তীব্র সংকট। গরু ও ছাগল ক্রয়-বিক্রয়ের নির্দিষ্ট জায়গার অভাব। সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান বেচাকেনার জায়গার ব্যবস্থা না থাকা।
হাটের জায়গায় গড়ে ওঠা মুরগির খামারের ভাড়াটিয়া আনিসুর রহমানবলেন, আগে যিনি হাটের কালেক্টর ছিলেন, আমি তার কাছ থেকেই দোকানটি ভাড়া নিয়েছি। মাসে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা ভাড়া দেই। জায়গাটি বৈধ না অবৈধ, তা আমার জানা নেই। সরকার বা হাট কর্তৃপক্ষ যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমি তা মেনে নেব।
সেলুন মালিক বিমল দেবদাসজানান, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে তিনি পাঁচ বছরের চুক্তিতে দোকানটি নিয়েছেন। তিনি বলেন, জায়গাটা ফাঁকা পেয়ে নিয়েছিলাম, পরে জেনেছি এটি হাটের জায়গা। এখন আমার কী করতে হবে তা আমি জানি না।
মুদি দোকানদার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শেড ঘরে স্থাপনা তৈরি করা অবৈধ আমি জানি, তবে নিজের মালামালের নিরাপত্তার স্বার্থেই আমি এই দোকানটি বানিয়েছি।
আইন ও বিধি বলছে, ‘বাংলাদেশ হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী, যথাযথ অনুমতি ছাড়া সরকারি খাস জমিতে কোনো স্থাপনা বা ঘরবাড়ি তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া আইনের ২০ ও ২৪ ধারা অনুযায়ী যত্রতত্র পশুর বর্জ্য ফেলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করলে আর্থিক জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।
অথচ বুড়িরহাটে এই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। হাটের ড্রেনগুলোর ওপর স্থাপনা গড়ে ওঠায় বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল। প্রতিদিন জবাই করা গরুর রক্ত ও বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলায় পুরো এলাকায় দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছে।
বর্জ্যের দুর্গন্ধে হাটের পাশের বসতবাড়ির মানুষজন চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। দুর্গন্ধে আত্মীয়-স্বজনরা বাড়িতে আসতে চান না, এমনকি মশা-মাছির উপদ্রবে তারা ঠিকমতো খাবারও খেতে পারছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা শারমিন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার স্বামী নেই, ছেলেমেয়ে নিয়ে এই বসতবাড়িতে চরম পরিস্থিতির শিকার হয়ে বসবাস করছি। কসাইরা প্রতিদিন উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলে যায়। দুর্গন্ধে বাড়িতে টেকা যায় না। ইজারাদারকে একাধিকবার জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি। আমরা সরকারের কাছে এর সুষ্ঠু সমাধান চাই।
ক্ষতিগ্রস্ত ইজারাদার সাইফুজ্জামান ফারুক তার অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, হাট নেওয়ার পর থেকেই আমরা চরম সমস্যায় ভুগছি। হাটের সরকারি জায়গা অবৈধ স্থাপনায় ভর্তি। আমরা অন্যের জায়গা ভাড়া নিয়ে হাট বসাচ্ছি, আর সরকার নির্ধারিত জায়গায় অবৈধ দখলদাররা ব্যবসা করছে, ভাড়াও খাচ্ছে! উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান পাচ্ছি না। দ্রুত সমাধান না হলে আমরা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হব, আর সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাবে।
এ বিষয়ে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হাট ইজারা হওয়ার আগেই এসব অবৈধ দোকানপাট সেখানে গড়ে উঠেছিল। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি। দ্রুত দখলমুক্ত করে ইজারাদারের কাছে হাটের জায়গা হস্তান্তরের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
দ্রুত এই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে হাটের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে না আনলে, আগামীতে এই ঐতিহ্যবাহী হাট ইজারা নিতে কেউ আগ্রহ দেখাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পড়ুন : সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে
সা/


