প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হামলার হুঁশিয়ারির পর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে রাতের আঁধারে বহু স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত আগের রাতের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরানে ‘আবারও কঠোরভাবে হামলার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিনে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় যুদ্ধবিরতির সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত সিরিক ও বন্দর আব্বাসসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। এদিকে নতুন হামলার পর ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘গতকাল ইরান জাহাজে যে বোমা হামলা চালিয়েছে, তারই প্রতিশোধ এটি। আবার এমন হলে এর চেয়ে আরও ভয়াবহ পরিণতি হবে।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ এই হামলা নিয়ে এখনও পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে এর আগে দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তার ‘তাৎক্ষণিক জবাব’ দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরির সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে এই হামলা চালানো হয়েছে।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর সাম্প্রতিক অযৌক্তিক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করছে।’
বিবিসি বলছে, ইরানের উপকূলীয় শহর কোনারাক ও চাবাহারেও একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে অন্তত আটটি বিস্ফোরণ হয়েছে। পাশাপাশি সিরিক ও জাস্ক বন্দরে দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এ ছাড়া আবু মুসা দ্বীপেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই দ্বীপের মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বন্দর আব্বাসে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে এবং বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একটি ব্যারাকে আগুন লেগেছে।
ইরানের একটি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, চাবাহারের তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দুটি দ্রুত চালু করা হয়েছে এবং তৃতীয়টিও শিগগির সচল হবে।
এর আগে বুধবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান কিছুক্ষণ আগে যোগাযোগ করেছে এবং তারা ‘খুবই আগ্রহ নিয়ে’ একটি চুক্তি করতে চায়। তিনি বলেন, ‘তারা আদৌ চুক্তির যোগ্য কি না, আমি জানি না। তারা সেই চুক্তি মানবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।’
এর আগে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে তারা ইরানে ‘শক্তিশালী’ হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে বুধবার ইরান জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার পর মঙ্গলবার ও বুধবারের পাল্টাপাল্টি হামলা ছিল সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ। পরে ট্রাম্প বলেন, গত মাসে ইরানের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির চুক্তি ‘শেষ হয়ে গেছে’। তিনি বলেন, ‘গত রাতে আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করেছি। সম্ভবত আজ রাতেও একইভাবে আঘাত করব।’
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি আর তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা করতে চাই না। তারা জঘন্য। জানেন জঘন্য কাকে বলে? তারা জঘন্য। তারা অসুস্থ মানসিকতার মানুষ।’
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে লেখেন, ‘অশালীন কথার জবাব আমরা অশালীন ভাষায় দিই না। আমরা জবাব দিই কাজে— নির্ভয়ে এবং সাহসের সঙ্গে।’
এদিকে আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, বুধবার নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জুনের মাঝামাঝি যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইরানশাহর বিমানবন্দরে হামলায় একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন।
সর্বশেষ হামলায় ইরানশাহর, বন্দর আব্বাস, কোনারাক, চাবাহার, বুশেহর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আক কালা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবারও শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি সৃষ্টির সক্ষমতা আরও কমাতে ইরানে অতিরিক্ত হামলা শুরু করা হয়েছে। ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসের কাছে ‘শত্রু লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
পড়ুন : সরকারি অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণে কড়াকড়ি
সা/


