রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকার জামতলার বালুর মাঠে মাদকসেবীদের আড্ডা ও গাঁজা কেনাবেচার অভিযোগের মধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মো. রিফাত ইসলাম (২৮) ওরফে ‘গাঞ্জা রিফাত’কে গ্রেপ্তার করেছে খিলক্ষেত থানা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার সন্ধ্যা প্রায় সাতটার দিকে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে রিফাতের কাছ থেকে গাঁজা, গাঁজা সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং একাধিক কল্কি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা আলামত জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে খিলক্ষেত থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া রিফাত ইসলাম নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকার জামতলার খ-১১৯ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা। তার বাবা মো. বাবুল মিয়া, যিনি এলাকায় ‘লইরা বাবুল’ নামে পরিচিত। মা রাশিদা বেগম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রিফাত দীর্ঘদিন ধরে নিকুঞ্জ টানপাড়া, জামতলা ও আশপাশের এলাকায় ‘গাঞ্জা রিফাত’ নামে পরিচিত। তাদের দাবি, তিনি শুধু গাঁজা বিক্রির সঙ্গেই জড়িত ছিলেন না, বরং এলাকায় মাদকসেবীদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে গাঁজা সেবন, তরুণদের নিয়ে আড্ডা এবং নতুনদের মাদকের প্রতি উৎসাহিত করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, রিফাতের বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোর ও তরুণদের নিয়ে নিয়মিত মাদকের আসর বসত। নতুনদের গাঁজা সেবনে উদ্বুদ্ধ করা এবং মাদকসেবীদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী গড়ে তোলার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছেন তারা। এসব কারণে অনেক পরিবার সন্ধ্যার পর সন্তানদের বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করতেন।
স্থানীয়দের দাবি, রিফাতের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট খিলক্ষেত থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যাচেষ্টা মামলায়ও তার নাম রয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৪২৭, ৩৮৯, ৫০৬ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
এ ছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, সে মব সৃষ্টি, ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, নিকুঞ্জ টানপাড়া একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। সেখানে প্রকাশ্যে মাদকসেবনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের মতে, একজন মাদক কারবারির পেছনে সাধারণত একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করে। তাই শুধু একজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনতে হবে।
খিলক্ষেত থানা পুলিশ জানায়, মাদকবিরোধী অভিযানে কোনো ধরনের শৈথিল্যের সুযোগ নেই। নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানা পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। নিকুঞ্জ, টানপাড়া, জামতলাসহ পুরো এলাকায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা অন্য কোনো পরিচয়ে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। যারা মাদক ব্যবসা, মাদক সেবনের আসর পরিচালনা কিংবা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও আরও জোরদার করা হবে।”
ওসির বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন নিকুঞ্জ টানপাড়া ও জামতলার বাসিন্দারা। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে এলাকায় মাদক কারবারিদের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে এবং প্রকাশ্যে মাদকসেবনের প্রবণতাও কিছুটা কমেছে। তবে তারা চান, অভিযান যেন সাময়িক না হয়ে নিয়মিতভাবে চলতে থাকে এবং মাদক সরবরাহকারী ও মূল হোতাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানই তরুণ সমাজকে মাদকের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের প্রত্যাশা, চলমান অভিযান অব্যাহত থাকলে নিকুঞ্জ টানপাড়া, জামতলা এবং সমগ্র খিলক্ষেত এলাকাকে ধীরে ধীরে মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসিক এলাকায় পরিণত করা সম্ভব হবে।
পড়ুন: সুইজারল্যান্ডকে ৩–১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা


