বিজ্ঞাপন

সবুজের মাঝে অমর তোমরা : মাইলস্টোনের হারিয়ে যাওয়া প্রাণ

একটি দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, বদলে দেয় অসংখ্য মানুষের জীবন। রেখে যায় এমন কিছু স্মৃতি, যা সময়ের সঙ্গে ম্লান হলেও হৃদয়ের গভীরে রয়ে যায়। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার পর অনেক শিক্ষার্থীর জীবনেও নেমে এসেছিল এমনই এক নীরব অন্ধকার। বন্ধু হারানোর শোক, মৃত্যুভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা তাদের শৈশবকে ভারী করে তুলেছিল।

সেই ভার কিছুটা হলেও লাঘব করার লক্ষ্য নিয়ে ১৬ জুলাই গাজীপুরের পুবাইলে ছুটি রিসোর্টে আয়োজন করা হয় “সবুজের মাঝে অমর তোমরা”-এর দ্বিতীয় পর্ব। ছুটি গ্রুপ ও রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকার যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই দিনব্যাপী আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল—প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিশুদের আবারও হাসতে শেখানো, খেলায় ফিরিয়ে আনা, নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের নিরাপদ একটি পরিসর তৈরি করা।

দিনের শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। এরপর মেডিটেশন সেশনে অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। ধীরে ধীরে মনকে শান্ত করার এই অনুশীলনের পর তারা ছুটে যায় বিশাল সবুজ মাঠে। ফুটবল খেলায় মেতে ওঠে সবাই। অনেক দিন পর হয়তো তারা শুধু খেলছিল না, বরং কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকার চেষ্টা করছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন স্মৃতিগুলো।

বিজ্ঞাপন


প্রকৃতির বিশালতা মানুষের মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে পুবাইলের সবুজ পরিবেশ যেন শিশুদের জন্য হয়ে উঠেছিল এক উন্মুক্ত নিরাময়ক্ষেত্র। খেলার পাশাপাশি তারা অংশ নেয় দলীয় বিভিন্ন কার্যক্রমে, যেখানে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলা, হাসা এবং নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।

অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ট্রি অব লাইফ’ শীর্ষক আর্ট থেরাপি। মনিরা রহমানের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই সেশনে রং, কাগজ ও তুলির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রকাশ করে নিজেদের অনুভূতি। অনেক সময় যে কথাগুলো মুখে বলা যায় না, সেগুলো ছবির ভেতর সহজেই ফুটে ওঠে। কারও আঁকা গাছে ছিল আশার রং, কারও ছবিতে ছিল হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর স্মৃতি, আবার কোথাও ফুটে উঠেছিল নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। শিল্পচর্চা এখানে শুধু একটি কার্যক্রম নয়, বরং মানসিক পুনরুদ্ধারের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে।

শিশুদের খেলাধুলার অংশটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশের প্রথম নারী ফুটবলার রেহানা পারভীন । তিনি বলেন হচ্ছে মাধ্যম যা দিয়ে শিশুদের মানসিক গঠন এবং যেকোনো ভয় বা আতঙ্ক দূর করা সম্ভব।

দিনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল স্মারক বৃক্ষরোপণ। মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো প্রতিটি শিশুর স্মরণে নামফলক সংবলিত একটি করে গাছ রোপণ করা হয়। শিক্ষার্থীরাই নিজ হাতে সেই চারা মাটিতে বসায়। এরপর এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এই বৃক্ষরোপণ ছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ছিল স্মৃতি সংরক্ষণের এক অনন্য প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছগুলো যেমন বড় হবে, তেমনি হারিয়ে যাওয়া শিশুদের স্মৃতিও প্রকৃতির বুকে বেঁচে থাকবে। শোককে স্মৃতিতে, আর স্মৃতিকে জীবনের শক্তিতে রূপান্তরের এক নীরব অঙ্গীকার যেন লুকিয়ে ছিল প্রতিটি চারাগাছে।

রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকার প্রেসিডেন্ট শরীফ উল্লাহ বলেন, মানবসেবাই রোটারির মূল আদর্শ। তাঁর মতে, শিশুদের মানসিক সুস্থতায় পাশে দাঁড়ানো শুধু একটি সামাজিক উদ্যোগ নয়, বরং মানবিক দায়িত্ব। অন্যদিকে ছুটি রিসোর্ট পুবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল ইসলাম বলেন, ব্যবসার পাশাপাশি সমাজের প্রতিও তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, আর সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই এমন আয়োজন।

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এক সাংবাদিকের মানবিক উপলব্ধি। উদ্যোগের প্রবক্তা শাহনাজ শারমীন জানান, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর বার্ন ইনস্টিটিউটে টানা ১২ দিন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে শিশুদের অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে এমন একটি আয়োজনের কথা ভাবতে অনুপ্রাণিত করে।

সমাপনী বক্তব্যে ছুটি গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফীর কথায় ফুটে ওঠে ভবিষ্যতের আশাবাদ। তিনি বলেন, আজ যে গাছগুলো রোপণ করা হয়েছে, একদিন সেগুলো বড় হয়ে ছায়া দেবে। তেমনি এই শিশুরাও একদিন শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাবে।

দুর্যোগের পর মানুষকে পুনরুদ্ধার করতে শুধু চিকিৎসা বা সময়ই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং পাশে থাকার আন্তরিকতা। শিশুদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে এমন উদ্যোগ কেবল একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হওয়া উচিত।

সবুজের মাঝে কাটানো একটি দিন হয়তো তাদের সব বেদনা মুছে দিতে পারেনি। কিন্তু সেই দিনটি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—অন্ধকারের পরও আলো থাকে, শোকের পরও জীবন এগিয়ে চলে, আর হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মুখগুলো স্মৃতির সবুজ ছায়ায় চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে।

পড়ুন : ‘স্বর্গভূমি বাংলা’ গ্রন্থে বাংলার ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল দিক

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন