রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩৬ জনের প্রাণহানির ঘটনার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই)। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে। আকাশে বিমানের শব্দ কিংবা কোথাও আগুনের দৃশ্য দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অনেকে।
যেভাবে ঘটেছিল ভয়াবহ দুর্ঘটনা
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, সোমবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও ভয়াবহতা।
বিমান বিধ্বস্তের পর সৃষ্ট আগুনে প্রাণ হারায় বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক। এ ঘটনায় অন্তত ৩৬ জন নিহত হন এবং আহত হন শতাধিক মানুষ। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।
এক বছর পরও শোক ও ক্ষোভে স্বজনরা
দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো পরিবারগুলো এক বছর পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। শোকের পাশাপাশি তাদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভও। বিশেষ করে দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।
নিহত শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, সকালে নিজের হাতে স্কুলে দিয়ে আসা সন্তানকে দুপুরে লাশ হিসেবে ফিরে পাওয়ার কষ্ট কখনো ভুলতে পারবেন না।
তিনি বলেন, “আমার দুই ছেলে ছিল। আগে দুজনকেই প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে আসতাম। এখন শুধু ছোট ছেলেকে নিয়ে আসি। স্কুলে শত শত শিক্ষার্থীর মধ্যে আজও আমার তানভীরকে খুঁজি। কিন্তু তাকে আর পাই না। শুধু তার শেষ দিনের হাসিমুখ আর স্মৃতিগুলো মনে পড়ে।”
দুর্ঘটনায় নিহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের বাবা মিনহাজ রহমান বলেন, এক বছর ধরে ছেলের পড়ার টেবিল আগের মতোই রয়েছে। বই-খাতা এখনো একই জায়গায় রাখা। তার মা নিয়মিত সেগুলো পরিষ্কার করে রাখেন। তিনি বলেন, মাহতাবকে ছাড়া তাদের পরিবার আর আগের মতো নেই।
নিহত তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার জানান, সরকার ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বললেও তারা সেই অর্থ গ্রহণ করেননি। তার ভাষায়, কোনো অর্থ দিয়েই সন্তানকে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “আমার আর কোনো দাবি নেই। শুধু চাই, স্কুলটি এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। এখনো স্কুলের ওপর দিয়ে বিমান চলাচল করে। আমার আয়মান চলে গেছে, কিন্তু সেখানে এখনো অনেক শিশু পড়াশোনা করছে। আমি চাই না আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি হোক।”
বিমান চলাচল নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিমান চলাচল অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, এত বড় দুর্ঘটনার পরও ওই এলাকায় বিমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
তানভীরের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, “প্রশিক্ষণ বিমান এখনো নিয়মিত উড়ছে। আগের তুলনায় আরও বেশি মহড়া হচ্ছে। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি, আবার কোনো দুর্ঘটনা ঘটে কি না সেই ভয় কাজ করে।”
তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের অংশ সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রস্তুত রাখতে নিয়মিত মহড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্মরণে দুই দিনের কর্মসূচি
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর উপলক্ষে দুই দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্মরণ অনুষ্ঠান, দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি এবং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত।
কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দুর্ঘটনাস্থল সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। সেখানে স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার দেবেন। নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে এবং এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া স্মৃতিচারণার অংশ হিসেবে নিহতদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিকথা ও বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে। এতে নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।
পড়ুন: বিশ্বকাপ জয় নেইমারকে উৎসর্গ করলেন নিকো উইলিয়ামস
আর/


