বিজ্ঞাপন

ক্যানসার চিকিৎসায় বিশ্ব ও বাংলাদেশ

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর অনকোলজি ওয়ার্ডে প্রতিদিন একই চিত্র দেখা যায়। রোগীতে ঠাসা অপেক্ষাগৃহ, বিলম্বিত রেডিওথেরাপি এবং চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খাওয়া পরিবার। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ভারতের কিছু অংশে ক্যানসার চিকিৎসা যখন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন অনেক বাংলাদেশি রোগী দেশে মৌলিক সেবা পেতেই সংগ্রাম করছেন। ক্যানসারের চিকিৎসা এখন আর সব রোগীর জন্য একই পদ্ধতিতে হয়না।

বিশ্বজুড়ে ইমিউনোথেরাপি রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মেলানোমা, ফুসফুস ক্যানসার ও কিডনি ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে সহায়তা করছে, আর কার-টি (কাইমেরিক অ্যান্টিজেন টি সেল) থেরাপি কিছু রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। প্রিসিশন অনকোলজিও চিকিৎসার ধরন বদলে দিচ্ছে টিউমারের অবস্থানের বদলে তার জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো সাধারণ মানুষের নাগালে আছে কি না, সাশ্রয়ী কি না এবং সঠিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো দিয়ে তা সমর্থিত কি না। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কার্যকর রেডিয়েশন যন্ত্রের তীব্র সংকট, হাতে গোনা কয়েকটি শহরে ক্যানসার সেবা কেন্দ্রীভূত থাকা এবং চিকিৎসার খরচ, যা অনেক পরিবারকে ঋণে জর্জরিত করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রিসিশন অনকোলজি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কারণ এটি মূলত উন্নত রোগনির্ণয়ের ওপর নির্ভরশীল। জিনোম পরীক্ষার মাধ্যমে ইজিএফআর (EGFR), এইচইআর২ (HER-2), বিআরএএফ (BRAF) ও কেআরএএস (KRAS)-এর মতো মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব, যা চিকিৎসকদের ফুসফুস, পাকস্থলী কিংবা কোলোরেক্টাল ক্যানসার রোগীদের জন্য আরও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা বেছে নিতে সহায়তা করে। বাংলাদেশে ক্যানসার প্রায়ই দেরিতে শনাক্ত হয়, যখন চিকিৎসা কঠিন ও অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। একটি শক্তিশালী রোগনির্ণয় ব্যবস্থা সম্পূর্ণ উচ্চপ্রযুক্তির অনকোলজি নেটওয়ার্ক তৈরির অপেক্ষা না করেই ফলাফল উন্নত করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও (AI) ক্যানসার চিকিৎসায় এমনভাবে প্রবেশ করছে, যা অন্য অনেক উচ্চ-প্রযুক্তির চিকিৎসার তুলনায় বাংলাদেশের জন্য দ্রুত উপকারে আসতে পারে।

প্যাথলজি স্লাইড ও রেডিওলজি স্ক্যান বিশ্লেষণে এআই-সহায়তা দেশের সীমিত সংখ্যক বিশেষজ্ঞের কাজের চাপ কমাতে পারে, বিশেষত যেসব হাসপাতালে অনকোলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের সংকট রয়েছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এসব প্রযুক্তি আগেভাগে স্ক্রিনিং ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এআই তখনই কার্যকর হবে যখন ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত জনবল, নির্ভরযোগ্য গবেষণাগার এবং ফলাফল অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার মতো যথাযথ রেফারেল ব্যবস্থা থাকবে। বাংলাদেশের ক্যানসার সমস্যা শুধু চিকিৎসাগত নয়, কাঠামোগতও বটে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক সরকারি হাসপাতালে এখনো কার্যকর রেডিয়েশন যন্ত্র নেই, আর বেসরকারি চিকিৎসা সাধারণ পরিবারের সাধ্যের অনেক বাইরে।

সামনের পথ স্পষ্ট, রাজধানীর বাইরে আরও মলিকিউলার ডায়াগনস্টিক ল্যাব স্থাপন, স্থানীয় চিকিৎসকদের জিনোমিক মেডিসিনে প্রশিক্ষণ প্রদান, ক্যানসার সেবার জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর মতো বাংলা ভাষায় জনসচেতনতামূলক প্রচারণা। স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক রোগনির্ণয়কে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসেবার অংশ হয়ে উঠতে হবে রোগ অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার পরই মানুষ তা খুঁজবেন, এমনটা যেন না হয়। মানুষকে সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো সম্পর্কেও জানতে হবে। ক্রমাগত থাকা মাংসপিণ্ড, না সারা ক্ষত, অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ এবং কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনকে কখনো উপেক্ষা করা বা ঘরোয়া উপায়ে সারানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। ক্যানসার যত দ্রুত শনাক্ত হবে, সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা তত বেশি থাকবে এই বার্তা বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছাতে হবে।

লেখক পরিচিতি : এস দানিশ কাদির একজন ফার্মাসিস্ট ও বায়োকেমিস্ট, যাঁর গবেষণা ক্যানসার বায়োলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ইমিউনোলজি, অর্গানয়েড প্রযুক্তি এবং কম্পিউটেশনাল বায়োলজি নিয়ে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালি থেকে বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি মানবিক আচরণের ওপর জোর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন