অবশেষে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানার সমালোচিত ও বিতর্কিত ওসি জেল্লাল হোসেনকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) রাত ১০ টার দিকে ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ জেল্লাল হোসেনকে ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনে ওআর ( অফিস রিজার্ভ), ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনের ওআর কবির হোসেনকে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ ও ঝিনাইদহ সদর সার্কেলে সংযুক্ত মো. জুলফিকার আলীকে হরিণাকুণ্ডু থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে বদলি করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশের একটি সুত্র বলছে, সাধারণত কোনো থানা থেকে ওসি প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হলে নতুন পোস্টিং বা পদায়নের আগ পর্যন্ত সাময়িক সময়ের জন্য এবং প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের এই ওআর (অফিস রিজার্ভ) এ সংযুক্ত করা হয়।
এদিকে থানার ওসি জেল্লাল হোসেনকে বদলি করায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে কালীগঞ্জবাসী। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ওসির বদলিতে আলহামদুলিল্লাহ লিখে পোস্ট করছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, এমন বিতর্কিত ওসি এর আগে কখনো কালীগঞ্জবাসী দেখেননি। তিনি একদমই অযোগ্য। এমন পুলিশ সদস্য বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে।
জানা গেছে, গত ১৭ জুলাই কালীগঞ্জ থানায় ওসি জেল্লাল হোসেনের সামনে নাগরিক টিভির প্রতিনিধি মিশন আলী, দৈনিক যুগান্তর ও দীপ্ত টেলিভিশনের প্রতিনিধি শাহরিয়ার আলম সোহাগের উপর হামলা চালায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। এসময় ওসি জেল্লাল হোসেনের সঙ্গে হামলাকারীদের সখ্যতা থাকায় তাদেরকে নিরাপদে স্থান ত্যাগ করান তিনি। এ ঘটনায় এজাহার দেওয়ার ১০ ঘন্টা পর মামলা রেকর্ড করেন তিনি। হামলাকারীদের সাথে থানায় শালিস বসিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে ওসি জেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও গত ১১ জুন কালীগঞ্জ উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে নাজমুল হোসেন নামে একজনকে আটক করে। এসময় সেখান থেকে ২ পিস ইয়াবা পেলেও তাকে ১০ পিস ইয়াবা দিয়ে আদালতে প্রেরণ করে। এসময় টেবিলের উপর থাকা দুটি স্মার্টফোন গায়েব করার চেষ্টা করেন ওসি। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ১৫ জুলাই প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে পরদিন ভুক্তভোগীকে দুটি ফোনই ফেরত দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে পুলিশ। দৈনিক যুগান্তর ও দীপ্ত টিভির প্রতিনিধি শাহরিয়ার আলম সোহাগ ও ভুক্তভোগী নাজমুল হোসেন তাদের লিখিত জবানবন্দি তদন্ত কমিটিকে দিয়েছেন।
এদিকে গত ২৩ জুন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বিজুকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রথমে মোস্তাফিজুর রহমান বিজুকে ১নং আসামি করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান ওসি জেল্লাল হোসেন। পরে তাকে ৯ নং আসামি দেখিয়ে মামলা রেকর্ড করা হয়।
এদিকে শহরে আড়পাড়া এলাকার মাদক ব্যবসায়ী রুপালি খাতুনের কাছ থেকে মাসিক ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওসি জেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ থানায় যোগদানের পর পুলিশের মাদক বিরোধী অভিযান একদমই কমে যায়। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় উপজেলায় মাদক বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে সম্প্রতি পাড়া-মহল্লায় অভিযানে নামে এলাকাবাসী। এছাড়াও গত কয়েক মাসে উপজেলা জুড়ে চুরি-ডাকাতিসহ আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের আটক না করার অভিযোগ রয়েছে ওসি জেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালীগঞ্জ থানায় যোগদানের আগে তিনি যশোরের চৌগাছা থানায় ওসি (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি এক যুবলীগের নেতার সাথে সখ্যতা গড়ে শালিস বাণিজ্য করতেন। ওই থানায় দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি মাথার উপর নৌকা প্রতিক বসানো একটা কাঠের চেয়ারে বসে থাকা ছবি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেন।
স্থানীয় সংবাদকর্মী মিশন আলী বলেন, ওসির সামনে তার পেটুয়া বাহিনী সাংবাদিকদের উপর হামলা করে আর ওসি তাদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ করিয়ে দেয়। এই ওসির বিরুদ্ধে আসামির ফোন গায়েব, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক টাকা নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
বদলির বিষয়ে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, হরিণাকুণ্ডুতে ওসি ছিল না। সেখানে মো. জুলফিকার আলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কালীগঞ্জের ওসি জেল্লাল হোসেনকে পুলিশ লাইনে ওআর আর কবির হোসেনকে কালীগঞ্জ থানার ওসি হিসেবে বদলি করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা নিয়মিত পোস্টিং।
পড়ুন : গ্রামাঞ্চলে ‘হেলথ হাব’ গড়ে তোলা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সা/


