বিজ্ঞাপন

আমজাদ হোসেনের ঘর যেন হারিয়ে যাওয়া কলের গান ও গ্রামোফোনের জাদুঘর

এক সময় বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল গ্রামোফোন। কালো রঙের গোলাকার রেকর্ডে বাজত প্রিয় শিল্পীদের গান, শোনা যেত ঐতিহাসিক ভাষণ। বাড়ির উঠানে কিংবা বৈঠকখানায় গ্রামোফোনের চোঙা থেকে ভেসে আসা সুরে মুগ্ধ হতো মানুষ। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তনে ক্যাসেট, সিডি, মেমোরি কার্ড পেরিয়ে এখন গান পৌঁছে গেছে অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে। হারিয়ে গেছে সেই কলের গান আর গ্রামোফোনের যুগ।

তবে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার জুম্মাহাট কেবল কৃষ্ণ গ্রামের আমজাদ হোসেন যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সময়টাকেই আটকে রেখেছেন নিজের ঘরে। তাঁর বাড়ির একটি ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি পুরোনো গ্রামোফোন, হাজার হাজার রেকর্ড ও অডিও ক্যাসেট। ঘরটি দেখে মনে হয়, এটি কোনো পুরোনো দিনের সংগ্রহশালা নয়, যেন হারিয়ে যাওয়া কলের গান ও গ্রামোফোনের জীবন্ত জাদুঘর।

নিজের শখ ও ভালোবাসা থেকে বছরের পর বছর ধরে এসব সংগ্রহ করেছেন আমজাদ হোসেন। বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ২০টি গ্রামোফোন, ৫ হাজার গ্রামোফোন রেকর্ড, ১ হাজার অডিও ক্যাসেট।এসবের মধ্যে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের বহু খ্যাতিমান শিল্পীর গান।

আমজাদের সংগ্রহে শুধু ভাওয়াইয়া কিংবা লোকগানই নয়।রয়েছে হৈমন্তী শুক্লা, কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে, অনুপ ঘোষাল, অনুপ জালোটা, মোহাম্মদ রফী, পঙ্কজ উদাসসহ বিভিন্ন সময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের গান। পুরোনো দিনের এসব রেকর্ডের অনেকগুলো এখন আর সহজে চোখে পড়ে না।

আমজাদ হোসেন বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গান শোনার সুযোগ থাকলেও পুরোনো গ্রামোফোনের সুরের আলাদা একটা আবেদন রয়েছে। শখের বসেই তিনি এসব সংগ্রহ শুরু করেন। ধীরে ধীরে সংগ্রহ বাড়তে থাকে। একসময় নিজের বাড়িই হয়ে ওঠে পুরোনো গান ও গ্রামোফোনের এক ব্যতিক্রমী ঠিকানা।

তবে এই সংগ্রহের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি এখন তাঁর মনে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের শঙ্কা। কারণ মূল্যবান রেকর্ড ও যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ। কিন্তু টিনের ঘরে অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মধ্যে দিনের পর দিন পড়ে থাকায় অনেক রেকর্ড ও ক্যাসেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আমজাদ হোসেনের স্ত্রী মোসলেমা বেগম বলেন, বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে তিনি এসব পুরোনো গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও রেকর্ড দেখে অবাক হন। সংগ্রহের নেশা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে ঝগড়াও হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনিও বুঝতে পেরেছেন, এগুলো কেবল পুরোনো জিনিস নয়, এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সময়ের ইতিহাস। বর্তমানে জায়গার সংকটে রেকর্ডগুলো বিছানা ও খাটের নিচে রাখায় সেগুলোও ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আমজাদের বাড়িতে শুধু স্থানীয় মানুষই নয়, দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে পুরোনো গ্রামোফোন ও রেকর্ড দেখতে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, অবসর সময়ে তাঁরা আমজাদের বাড়িতে এসে পুরোনো দিনের শিল্পীদের গান শোনেন। জেলা ও জেলার বাইরের অনেক মানুষও গ্রামোফোন দেখতে এখানে আসেন। বিষয়টি তাঁদের কাছে আনন্দের ও আগ্রহের।

দর্শনার্থী অর্ণব বলেন, কলের গান ও গ্রামোফোন সে আগে টেলিভিশন, সিনেমা কিংবা অনলাইনে দেখেছে। তবে বিদ্যুৎ ছাড়াই যে এসব যন্ত্রে গান বাজানো যায়, তা তার জানা ছিল না। সরাসরি দেখে তার কাছে বিষয়টি বেশ ভালো লেগেছে।

কবি সাম্য রাইয়ান মনে করেন, আমজাদ হোসেনের এই সংগ্রহ শুধু ব্যক্তিগত শখের বিষয় নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও সংগীতের ঐতিহ্য। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তাঁর সংগ্রহের জন্য একটি নিরাপদ ও আধুনিক সংরক্ষণাগার তৈরি করা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

আমজাদ হোসেনের স্বপ্নও এখন ব্যক্তিগত সংগ্রহের গণ্ডি পেরিয়ে বড় হয়েছে। তিনি চান, তাঁর সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠুক একটি স্থায়ী কলের গান মিউজিয়াম। সেখানে পুরোনো গ্রামোফোন, রেকর্ড, ক্যাসেট ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, একসময় কীভাবে মানুষ গান শুনত এবং সংগীতের সঙ্গে কীভাবে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে।

কিন্তু সহযোগিতার অভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাঁর সংগ্রহের অনেক রেকর্ড ও যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া না হলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে দুর্লভ এসব সামগ্রী।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে গ্রামোফোন আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। কিন্তু কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামের আমজাদ হোসেনের ঘরে এখনো বেঁচে আছে সেই সোনালি সময়ের গান, যন্ত্র ও স্মৃতি। যথাযথ উদ্যোগ ও সংরক্ষণ করা গেলে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ শুধু একটি পরিবারের শখের স্মৃতি হয়ে থাকবে না—বরং উত্তরবঙ্গের সংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এক দলিল হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : রেলবাজার হাটে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান, কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ধ্বংস

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন