সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির নেতারা বলেছেন, ‘৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত’, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’সহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এখন দলীয়করণ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, ক্যাম্পাসে সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পথেও সরকার এগোচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তারা।
দলের মতে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণ যে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা করেছিল, তা চরম হতাশায় পরিণত হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের ছয় মাস: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা! জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস কম সময় নয়। এটি সরকারের মেয়াদের ১০ ভাগের এক ভাগ। তবে ছয় মাসের মধ্যেই সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার হিসাব করা ঠিক হবে না। সরকারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, শাসনব্যবস্থা, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গণতান্ত্রিক চর্চার উন্নয়নসহ বিভিন্ন সূচক রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব সূচকে ছয় মাসে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে জীবনমানের উন্নতি না হয়ে আরও অবনতি হয়েছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন নিয়োগে দলীয় লোক নিয়োগ এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক সহিংসতা সরকারের সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন মঞ্জু। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং ১ হাজারের বেশি নতুন কলকারখানা চালু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকার নতুন কর্মসংস্থানের আশা দেখালেও বেকারত্ব আরও বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সব দলকে নিয়ে আলোচনায় বসার পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা শোনেনি বলে দাবি করেন মঞ্জু। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসে আগের মাফিয়া চক্র এখনো বিদ্যমান।
প্রধানমন্ত্রীর আচরণ ও কর্মযজ্ঞে মিতব্যয়িতা, সময়ানুবর্তিতা এবং জৌলুস পরিহার করে সাদামাটা জীবনযাপনের যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার প্রতিফলন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ধর্মীয় পুরোহিতদের ভাতা চালুসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক অর্থনীতিতে গতি আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কোনো প্রভাব সমাজে দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি করেন মঞ্জু। বরং এসব কর্মসূচি নিয়ে নানা দুর্নীতির অভিযোগ আসছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সরকার যেভাবে দেশ চালাচ্ছে তাতে বিরোধী দলের আন্দোলন করারই কোন দরকার হবেনা। জনদুর্ভোগের কারণে সাধারণ নাগরিকেরাই ধৈর্য্য হারিয়ে রাস্তায় নামবে।’
তিনি আরও বলেন, ছয় মাসের সার্বিক মূল্যায়নে সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তে সরকার ‘সবার আগে দলীয়তন্ত্রকে’ প্রাধান্য দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি আবার ফিরে আসছে, যা কাম্য ছিল না। তবে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহনশীলতা রয়েছে, এটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখেন তিনি। পুরো মেয়াদে সরকারের এই রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ভারত সফরের বিষয়ে সরকারের অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বলেও জানান ব্যারিস্টার ফুয়াদ।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির ভাষায় গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ৩১ দফা চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। এটি বিএনপির নিজস্ব দফা। সেই দফাগুলোর ৮ থেকে ১০টি অমান্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
দলীয় নিয়োগের বিষয়ে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হলে সমস্যা নেই।
ক্রীড়াঙ্গনকে দলীয়করণ না করার প্রতিশ্রুতিও বিএনপি রাখেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিচারবিভাগ ও দুদক পুনর্গঠন এবং নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিএনপি তাদের ওয়াদা রাখেনি বলে দাবি করেন ফুয়াদ।
তিনি বলেন, ‘ছয় মাসের মধ্যে বিএনপি তাঁর ৩১ দফা ভুলে গিয়েছে।’
গুম ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করে আওয়ামী লীগের আইনের চেয়েও দুর্বল আইন করা হয়েছে। যারা গুম করে, তাদেরই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষমতা বিএনপি সরকার দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কোনো সংসদে নীতিমালা না করে জ্বালানি খাতকে বেসরকারি খাতে দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ। তিনি বলেন, তারা বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে নন, তবে তা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হতে হবে।
জঙ্গি ইস্যুতে সব দলকে নিয়ে মোকাবিলার পরামর্শ দেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ।
সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এফসিএ, এনইসি সদস্য ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল) গাজী নাসির, কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
পড়ুন: সরকারের ১৮০ দিনের হানিমুন পিরিয়ড শেষ হয়েছে: শিক্ষামন্ত্রী
আর/


