বিজ্ঞাপন

নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি, বাড়ছে ভোগান্তি

প্যাকেট আটার কেজি ৬৫ টাকা শুনে যেন চোখ কপালে উঠল ক্রেতা রাহেলা বেগমের। গতকাল বুধবার রাজধানীর তেজগাঁও সমিতি বাজার থেকে আটার এমন দাম শুনে দোকানিকে তিনি বললেন, ‘১৫-২০ দিন আগেও তো ৫৫ টাকায় কিনলাম। কেজিতে এক লাফে ১০ টাকা বাড়াইলেন কেন?’ দোকানির সাফ জবাব– কোম্পানিকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন।

বিজ্ঞাপন

কারওয়ান বাজার থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে দুই কেজি চিনি কিনলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, ‘তিন দিন আগে ১১০ টাকা দরে এই দোকান থেকেই চিনি নিয়েছি, এখন কেজিতে ২০ টাকা বেশি নিলেন।’ সঙ্গে সঙ্গেই তুহিন জেনারেল স্টোরের দোকানি মো. রায়হান বলে উঠলেন, ‘চিনির বস্তায় (৫০ কেজি) এক দিনে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা বাড়িয়েছে ডিলাররা। তাহলে খুচরা ব্যবসায়ীরা কি বাড়ি থেকে এনে লোকসান দেবে?’

শুধু রাহেলা আর মনজুর নন, নিত্যপণ্যের দামের উত্তাপে অনেকেই এখন ক্ষুব্ধ, ত্যক্ত-বিরক্ত। বাজারে গিয়ে পণ্যের দামের সঙ্গে খরচের হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করতে হচ্ছে বাজারের ফর্দে। কেউ কেউ প্রয়োজনের চেয়ে কিনছেন কম। আবার কাউকে আপস করতে হচ্ছে পণ্যের মানের সঙ্গে।

যদিও সরকারের দাবি, নিত্যপণ্যের দাম কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি কমলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমার কথা। বাস্তব চিত্র পুরো ভিন্ন। বিবিএসের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন না। আটা-ময়দা থেকে শুরু করে তেল-সাবান, মাছ-মাংস, সবজি সব কিছুরই দাম বাড়তি। কোনো কোনো কোম্পানি দাম অপরিবর্তিত রেখে প্যাকেটে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে সমন্বয় করছেন।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো মূল্যস্ফীতি। বিবিএস যে তথ্য দিচ্ছে, বাজারের চিত্র তা প্রমাণ করে না। দু-একটি ছাড়া প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে স্পষ্ট যে সরকারের শুল্ক বা ট্যাক্স কমানোর সুবিধা সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না, যা অর্থনীতির বড় দুর্বলতা।

তারা বলেন, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় কমিশন এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আমদানিকারক অনেকেই একে অপরের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা (সিন্ডিকেট) করে দাম নির্ধারণ করেন। এতে বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব দেখা দেয়। এই সুযোগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়ান। 

যদিও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে খরচ বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে। অন্যদিকে আমদানি ও প্রক্রিয়াজাতকারীরা বলছেন, সাম্প্রতিক গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচ ও সরবরাহে। 

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা বাজারে নজরদারি বাড়ানো, কৃত্রিম সংকট রোধ, সিন্ডিকেট দমন ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাঁদাবাজি বন্ধের আহ্বান জানান। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসন করে উৎপাদন খরচ কমানোর পরামর্শ দেন তারা।

বিবিএসের তথ্য হয়তো কিছুটা মিলবে চালের বাজারে। কারণ মাসখানেক ধরে স্থিতিশীল রয়েছে চালের দাম। প্রতি কেজি সরু (মিনিকেট) চাল ৭০ থেকে ৭৫, মাঝারি (পাইজাম-বিআর-২৮) ৫৫ থেকে ৬৫ এবং মোটা (চায়না ইরি-গুটিস্বর্ণা) কেনা যাচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তিন ধরনের চালের দামই কমেছে যথাক্রমে ৩, ১১ ও ৯ শতাংশ।

তবে চালের বাজারের এই স্বস্তি যেন কেড়ে নিচ্ছে অন্যান্য পণ্য। যেমন, আটা-ময়দার বাজারে চিত্র উদ্বেগজনক। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  গত এক মাসে কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে খোলা আটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা ও প্যাকেট আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ময়দার কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা বেড়ে খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ এবং প্যাকেট ময়দা ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, এক বছরে খোলা আটার দাম ৮, প্যাকেট আটার ৭ ও খোলা ময়দার ৬ শতাংশ দাম বেড়েছে।

নিম্ন-মধ্যবিত্তদের পরিবারে প্রতিদিনই কমবেশি মসুর ডালের ব্যবহার হয়। সব জাতের ডালের কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। এর মধ্যে মোটা দানার মসুর ডালের কেজিতেই বেড়েছে ৫ টাকা।

রান্নার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভোজ্যতেল। বছরের বেশির ভাগ সময়ে আলোচনায় থাকা এই পণ্যও ভোগাচ্ছে। গত ২৯ এপ্রিল সরকার প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৮০ টাকা ও পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাজারে সেই চিত্র নেই। নিম্ন আয়ের মানুষ খোলা তেল বেশি কেনেন। বাজারে খোলা সয়াবিনের লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৮৬ থেকে ১৯২ টাকায়। মধ্যবিত্ত বেশির ভাগ ক্রেতার পছন্দ ৫ লিটারের বোতল। এক সপ্তাহ আগে এই বোতল ৯৫৫ থেকে ৯৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন গুনতে হচ্ছে ৯৭৫ টাকা। এ ছাড়া খোলা পাম অয়েলের লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৬৬ থেকে ১৭০ টাকায়, যা সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রায় ৪ টাকা বেশি। টিসিবিও বলছে, এক বছরে খোলা সয়াবিনের লিটারে গড়ে ১২ ও পাম অয়েলের দর ৯ শতাংশ বেড়েছে। 

কারওয়ান বাজারের আবদুর রব স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. নাঈম সমকালকে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে বাজারে তীর ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের সরবরাহ নেই। 
ডিম-মুরগির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। এখন ব্রয়লারের কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং ডিমের ডজন ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে দুটি পণ্যের দর যথাক্রমে ৯ ও ৩ শতাংশ বেড়েছে। অস্বস্তি মাছ-মাংসের দামেও। বছরের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের মাছের কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা এবং গরুর মাংসের কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।

অস্বাভাবিক দর বেড়েছে চা-নাশতার উপকরণে। চার-পাঁচ দিন আগে খোলা চিনির কেজি ছিল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। গতকাল বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা দরে। কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। গুঁড়া দুধ ব্র্যান্ডভেদে কেজিতে ২০ থেকে ১২০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি গুঁড়া দুধ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৯৬০ টাকা। এক বছরে এসব দুধের দর যথাক্রমে সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ বেড়েছে। সম্প্রতি মিল্কা ভিটাও তরল দুধের লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়েছে। পোলাওয়ের চালের দাম দুই মাসের ব্যবধানে কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। খোলা পোলাও চালের কেজি ১৯০ থেকে ২০০ এবং প্যাকেট চাল ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা।

ভোগ্যপণ্যের বাইরে নিত্যব্যবহার্য পণ্যও পকেট কাটছে ভোক্তার। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান,  মাসখানেক আগে ইউনিলিভারের ৩০০ গ্রাম ওজনের ভিমবারের দর ছিল ৪০ টাকা। দাম এখনও তা-ই। তবে কৌশলে ওজন ২৫ গ্রাম কমিয়ে করা হয়েছে ২৭৫ গ্রাম। একই কৌশলে এগিয়েছে ম্যারিকো বাংলাদেশ। মাস দুয়েক আগে তাদের প্যারাসুট ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রামের বোতলের দর ছিল ২০০ টাকা। এখন ওজন ১০ গ্রাম কমিয়ে ১৯০ গ্রাম করা হয়েছে। দামও বাড়ানো হয়েছে ২০ টাকা। এভাবে নীরবে দাম বেড়েছে ডিটারজেন্ট পাউডারেরও। প্রতি কেজি হুইল পাউডারে ২০ টাকা বেড়ে ১৬৫ ও রিন পাউডারের দর ১৫ টাকা বেড়ে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু ব্র্যান্ডের শরীরে মাখা সাবানের দামও বেড়েছে বলে জানান খুচরা বিক্রেতারা। একইভাবে কিছু ব্র্যান্ডের বিস্কুটের প্যাকেটের দাম অপরিবর্তিত রেখে পরিমাণে কমানো হয়েছে।

তবে কিছু পণ্যের দাম বেশ কম দেখা গেছে। যেমন, প্রতি কেজি আলু ২৫ থেকে ৩০ এবং পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও এর চেয়ে অনেক কম দর পাচ্ছেন কৃষক। এর অর্থ, কৃষক দাম না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা ফুলছেন। 

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, স্বচ্ছ নজরদারি না থাকায় অনেক জিনিসের দামই বেড়েছে। দরিদ্র মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। পণ্যের আমদানি ও বাজারমূল্য পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গোপনে ওজন কমিয়ে কোম্পানিগুলো ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা করছে। সরকারের উচিত কঠোর তদারকির মাধ্যমে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আবু ইউসুফ বলেন, উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর ধাপে ধাপে যে চাঁদাবাজি বা অনৈতিক লেনদেন হয়, তা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ২০-২৫টি পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর জন্য আলাদা ‘এসেনশিয়াল ফুড ইনফ্লেশন ইনডেক্স’ তৈরি করা দরকার এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা উচিত।

জেলা পর্যায়ে যে বাজার তদারকি কমিটি আছে, সেগুলোকে শুধু নামমাত্র না রেখে কার্যকর করার তাগিদ দেন তিনি। আবু ইউসুফ বলেন, সরকার যতবারই ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করেছে, তা বাজারে বাস্তবায়ন হয়নি। 

নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম চলছে বলে জানান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচাক আতিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, কোনো পণ্যের মোড়কে কম পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। দাম নিয়ন্ত্রণে নতুন মহাপরিচালক বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি শিগগিরই খাতভিত্তিক নিত্যপণ্যের উৎপাদক ও আমদানিকারকদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করার কর্মসূচি নির্ধারণ করছেন।

পড়ুন:দেশের বাজারে সোনার দামে বড় লাফ

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন