রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক দশক। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক চাপ, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরও প্রত্যাবাসনে কোনো সুরাহা হয়নি। আর এখন নতুন করে সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সশস্ত্র লড়াই।
বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হবে কার কাছে? মিয়ানমার সরকারের কাছে, নাকি রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির সঙ্গে সমঝোতা করে? এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অতীতে একসময় পুরো রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।
কিন্তু ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে আরাকান আর্মির সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক বাহিনী বড় ধরনের চাপে পড়ে। আরাকান আর্মি নিজেদের ‘আরাকান জনগণের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের’ দাবিদার হিসেবে তুলে ধরে। তারা এখন রাখাইনে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় রাখাইনে দুই ধরনের ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হয়েছে। প্রথমটি হলো নেপিডোর সামরিক সরকারের আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব। আর দ্বিতীয়টি হলো আরাকান আর্মির মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ। এই দ্বৈত বাস্তবতা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি।
আরাকান আর্মি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, রোহিঙ্গা সংকটকে তারা রাখাইনের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমস্যার অংশ হিসেবে দেখে। তারা মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রাখাইনের জনগণের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরেছে। তবে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আরাকান আর্মির ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে, সংঘাতের সময় রোহিঙ্গা ও বেসামরিক মানুষ উভয় পক্ষের সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, চলাচল ও মানবিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে অবশ্য রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তারা নিজেদের রাখাইনের সব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার পক্ষে শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।
মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার দাবি করছে, তারা যাচাই করা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমার সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তালিকার মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে তারা বলেছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রত্যাবাসন শুরু সম্ভব নয়।
মিয়ানমার সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা মূলত দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই বিষয়টি রাখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাখাইনের বড় অংশ যদি নেপিডোর নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তি করলেই প্রত্যাবাসন কার্যকর করা কঠিন।
আরাকান আর্মিকে বাংলাদেশ প্রকাশ্য কূটনৈতিক স্বীকৃতি না দিলেও বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তবে বাংলাদেশ এখনো আরাকান আর্মিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ঢাকার কৌশল হচ্ছে, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে মাঠের বাস্তবতার সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখা।
বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান অন্তর্বর্তী সরকার আমলে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি-সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি সেই সময় বলেছিলেন, ‘দেশের সীমান্ত সুরক্ষা এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের স্বার্থে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ দখল করে থাকা আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ সরকার।’ এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন আরাকান আর্মির প্রধান।
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার ইস্যু নয়। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমস্যা, মানবিক সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এবং মানবাধিকার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অংশ হিসেবে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ান এবং জাতিসংঘ—সব পক্ষই সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখলেও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান এখনো আসেনি। তবে আন্তর্জাতিক মহল রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রত্যাশা করে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অসম্ভব নয়, তবে বর্তমান কাঠামোয় দ্রুত প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা কম।
প্রত্যাবাসনের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাখাইনে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়ত, নেপিডো ও আরাকান আর্মির মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা। কেননা শুধু সীমান্ত পার করে মানুষ পাঠানো হলে তা টেকসই প্রত্যাবাসন হবে না।
পড়ুন : মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হতে আগ্রহী বাংলাদেশ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী


