দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। তীব্র ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সময়ই জ্বালানি স্বল্পতায় দেশের অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন আংশিক বা পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে গত ৭২ ঘণ্টায় গ্যাস ও কয়লার সংকটের কারণে দেশের ৬২টি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট যান্ত্রিক ও জ্বালানি জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বড় দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকা এবং আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ না আসায় জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিং বেড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এতে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দিন-রাত মিলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনির্ধারিত লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুতের পাশাপাশি তীব্র হয়েছে গ্যাস সংকটও। পাইপলাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় দিনের বেলায় অনেক বাসাবাড়িতে রান্না ব্যাহত হচ্ছে। একই কারণে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর কলকারখানার উৎপাদনও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। সাধারণ গ্রাহক থেকে ব্যবসায়ী—সব মহলেই এ নিয়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত
গত ৭২ ঘণ্টায় গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাগুলোতে গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। অনেক তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মীদের শিফটে ভাগ করে কাজ করাতে হচ্ছে। এতে দৈনিক উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ডাইং কারখানায় স্বাভাবিকভাবে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও গত তিন দিন ধরে অনেক কারখানায় তা শূন্য থেকে ১ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। দিনের পর দিন গ্যাসের চাপ না থাকা এবং রাতে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে শত শত ডাইং ও টেক্সটাইল মিলের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উৎপাদন সচল রাখতে অনেক কারখানা চড়া দামে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল কিনে জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ বাতিল করে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে শিল্প খাতে দৈনিক শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিপর্যস্ত সাধারণ জীবন
শিল্পকারখানার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সাধারণ নাগরিক জীবনও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। গত দুই দিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে গভীর রাতেও দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভোর থেকেই গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। দুপুরের পর কিংবা গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে প্রয়োজনীয় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা বৈদ্যুতিক স্টোভ ব্যবহার করছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। গত তিন দিন ধরে গ্যাস প্রেসার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় রাজধানীসহ বিভিন্ন মহাসড়কের পাশে সিএনজি চালিত যানবাহন ও গণপরিবহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যাও কিছুটা কম লক্ষ্য করা গেছে। এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ
শহরাঞ্চলে দিনে ৪ থেকে ৫ বার লোডশেডিং হলেও গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও করুণ। বিভিন্ন গ্রামের পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। তীব্র গরমে এতে জনজীবন নাকাল হয়ে পড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকার মৎস্যজীবীরা জানিয়েছেন, দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় বরফকলগুলোর উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইলিশের ভরা মৌসুমে মাছ সংরক্ষণের ওপর।
আমদানিনির্ভরতার বহিঃপ্রকাশ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট কোনো সাময়িক সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নীতিগত ভুল ও আমদানিনির্ভরতার বহিঃপ্রকাশ।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অভ্যন্তরে নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান ও খনন কাজে স্থবিরতা ছিল। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান না বাড়িয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা ও ডলার সংকটের সময় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর সঙ্গে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে আরও ব্যাহত হয়েছে।
সংকট কাটাতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছে। কাতার ও ওমানসহ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক দেশগুলো থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কার্গো কেনার জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আকস্মিক ঘাটতি সামাল দিতে ফার্নেস অয়েল ও জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো একটানা চালানো সম্ভব না হওয়া এবং গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ না বাড়লে আগামী কয়েকদিন লোডশেডিংয়ের বাড়তি চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু সাময়িক আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরে নতুন গ্যাস কূপ খনন ও অনুসন্ধান জোরদার না করলে এই জ্বালানি সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
পড়ুন: নেপালে বন্যা: কাদা থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার
আর/


