রুজভেল্ট জেটি ঘিরে খুলনার অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

0
10
বিজ্ঞাপন

একসময় দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী ছিল খুলনা। পাটকল, জুট প্রেস, দৌলতপুরের পাটের মোকাম, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল ও টেক্সটাইল মিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী শিল্পভিত্তি। এসব শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছিল হাজার হাজার মানুষের। শিল্পের সঙ্গে বিকশিত হয়েছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, আবাসনসহ নগর অর্থনীতির নানা খাত।

সময়ের সঙ্গে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই গতি অনেকটাই থেমে যায়। তবে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নদীপথের সুবিধা এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে খুলনার অর্থনীতিকে নতুন করে সক্রিয় করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে খুলনা মহানগরীর ৭ নম্বর ঘাট এলাকার রুজভেল্ট জেটি। জেটিটিকে আধুনিক ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) কিংবা বহুমুখী লজিস্টিক হাবে রূপান্তরের প্রস্তাব উঠেছে। সম্প্রতি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আয়োজিত অংশীজন সম্মেলনে মোংলা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলামের কাছে এ প্রস্তাব দেন।

ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা গেলে খুলনা ও মোংলা বন্দরের মধ্যে সরাসরি লজিস্টিক সংযোগ তৈরি হতে পারে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

খুলনা ও আশপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে উৎপাদিত পণ্য সড়ক বা রেলপথে রুজভেল্ট জেটিতে এনে কনটেইনারজাত করা গেলে বার্জ বা ছোট কার্গো ভেসেলে নদীপথে মোংলা বন্দরে পাঠানো সম্ভব হবে। একইভাবে মোংলা বন্দরে আমদানি করা পণ্যও নদীপথে এনে খুলনায় খালাস ও সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

শিল্পোদ্যোক্তা আরাফাত হোসেন রাহিব বলেন, “খুলনায় শিল্প স্থাপন করেও যদি পণ্য বন্দরে নিতে বেশি সময় ও খরচ হয়, তাহলে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্য জায়গা বিবেচনা করবেন। রুজভেল্ট জেটিতে আধুনিক লজিস্টিক সুবিধা তৈরি হলে খুলনার শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।”

মোংলা কাস্টমস এজেন্ট এসোশিয়েশন এর সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, “মোংলা বন্দর খুলনার খুব কাছেই। কিন্তু এই ভৌগোলিক সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে কার্যকর পরিবহন ও পণ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো দরকার। রুজভেল্ট জেটি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে।”

দেশে পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে একদিকে সড়কে চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। বড় পরিমাণ পণ্য নদীপথে পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে এই চাপ কমানো সম্ভব।

মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা সারসহ বিভিন্ন বাল্ক পণ্য বার্জে করে রুজভেল্ট জেটিতে এনে খালাস ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পরে খুলনা ও আশপাশের জেলায় সড়কপথে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

নদীপথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী মোঃ মনির হোসেন বলেন, “মোংলা থেকে পণ্য সরাসরি নদীপথে খুলনায় আনার ব্যবস্থা হলে পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। সময় ও খরচ কমলে এর সুফল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তাও পাবেন।”

নদীপথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত আরেক ব্যবসায়ী বলেন, “খুলনা-মোংলা নৌপথকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। রুজভেল্ট জেটিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে উঠলে নদীপথের ব্যবহার বহুগুণ বাড়তে পারে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, রুজভেল্ট জেটির পরিকল্পনাকে শুধু কনটেইনার ডিপোতে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুমুখী লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বাড়বে।

এখানে কনটেইনার ইয়ার্ড, গুদাম, রেকাল্ড স্টোরেজ, প্যাকেজিং, কার্গো হ্যান্ডলিং, ট্রাক ও বার্জ সেবা এবং মেরিন সার্ভিসের মতো বিভিন্ন সহায়ক সেবা গড়ে তোলা যেতে পারে।

খুলনা বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন সড়ক পথ কর্মচারি ইউনিয়ন এর সাধারন সম্পাদক সৈয়দ হুমায়ুন কবির বলেন, “একটি লজিস্টিক হাব তৈরি হলে শুধু জেটিতে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজই বাড়বে না। ট্রাক, বার্জ, গুদাম, প্যাকেজিং, পরিবহন, শ্রমিক ও বিভিন্ন সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। স্থানীয় ছোট ও মাঝারি ব্যবসাও এর সুফল পাবে।”

শিল্পোদ্যোক্তারা মনে করছেন, লজিস্টিক ব্যয় কমানো গেলে খুলনায় নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও বাড়বে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে রপ্তানিমুখী শিল্প, গুদাম ও প্যাকেজিং শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আমদানি ও রপ্তানীকারক মাহমুদুন চৌধুরী জনি বলেন, “খুলনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। নদী, মোংলা বন্দর, সড়ক ও রেল সবকিছুকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনা গেলে খুলনা আবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।”

মোংলা বন্দরের কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কনটেইনার ও কার্গো ব্যবস্থাপনার চাপও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে রুজভেল্ট জেটি মোংলা বন্দরের বিকল্প নয়; বরং সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। খুলনায় কিছু পণ্য ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করা গেলে মূল বন্দরের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে খুলনাকে মোংলা বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ হিন্টারল্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। জেটির নাব্যতা, নদীর গতি প্রকৃতি, বার্জ ও কার্গো ভেসেল চলাচল, জমি, সড়ক-রেল সংযোগ, পরিবেশগত প্রভাব, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা এবং মোংলা বন্দরের সঙ্গে অপারেশনাল সমন্বয়ের বিষয়গুলো যাচাই করতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক খান মেহেদী হাসান বলেন, “প্রস্তাবটির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আবেগের ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া উচিত নয়। বিনিয়োগের পরিমাণ, পণ্য পরিবহনের সম্ভাব্য চাহিদা, আয়-ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটি লাভজনক প্রমাণিত হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমেও এটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
রুজভেল্ট জেটিকে আধুনিক আইসিডি ও বহুমুখী লজিস্টিক হাবে রূপান্তর করা গেলে খুলনার শিল্পপণ্য সহজে মোংলা বন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। বাড়বে নদীপথে পণ্য পরিবহন, তৈরি হবে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে খুলনার শিল্প ও বাণিজ্যে নতুন গতি ফেরানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

এ কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, রুজভেল্ট জেটির সম্ভাবনা যাচাই করে দ্রুত একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। তাঁদের মতে, খুলনার পুরোনো শিল্পভিত্তিকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে রুজভেল্ট জেটি হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগস্থল।

পড়ুন: কালিয়াকৈরে সিএনজি-কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩

আর/

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.