একটা ফোনকল-অন্য প্রান্তে গণঅভূত্থানে ক্ষমতাচ্যূত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একসময় যাঁর একটি ফোনকলেই নড়েচড়ে বসতো প্রশাসন, বদলে যেত রাজনৈতিক সমীকরণ, সেই তিনিই এখন ফোনের ওপারে বসে বলছেন – দেশে ফিরতে চান, কিন্তু ফিরলে বিমানবন্দরেও প্রাণ যেতে পারে! ক্ষমতার মঞ্চ থেকে নির্বাসনের দূরত্বটা যেন এক ফোনকলেই ধরা পড়লো।
দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ টেলিফোনিক আলাপে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, নিজের নিরাপত্তা, তারেক রহমান, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলেছেন শেখ হাসিনা।
দেশে ফিরবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বলেছেন তার অর্থ হলো- দেশ যেন তারই। কারণ তিনি বলেছেন – দেশটা তো আমার। যদিও পরক্ষণেই শঙ্কা – ফিরলে বিমানবন্দরেই হত্যা করা হতে পারে। অর্থাৎ, ফেরার ইচ্ছেটা আছে, শুধু ফেরার পথটাই যেন কাঁটাতারে ঘেরা! আর সেই পথে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে কেউ যেন বিপদে না পড়েন – সেই সতর্কতাও তাঁর কণ্ঠে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, হাসিনা যে ঘোষণা দিয়েছিলেন ডিসেম্বরে ফিরবেন, সেই ঘোষণা থেকে সরে আসতেই কী নতুন বয়ান তৈরি করছেন?
ক্ষমতা চলে গেছে – কিন্তু ক্ষমতার ভাষা কি গেছে? দেশ ছেড়ে দূরদেশে বসেও যেন সেই পুরোনো সুরেই কথা বললেন শেখ হাসিনা। একটি দীর্ঘ ফোনালাপ। আর সেই ফোনের ওপারে অভিযোগ, আশঙ্কা, ক্ষোভ আর অতীতের হিসাব মেলানোর চেষ্টা।
দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা। কিন্তু ফিরতে ভয় পান। দেশকে নিজের বলে দাবি করেন, কিন্তু দেশের বর্তমান বাস্তবতাকে দেখেন মূলত নিজের নিরাপত্তার জানালা দিয়ে। এ যেন রাজনীতির এক অদ্ভুত আয়না – যেখানে ক্ষমতা হারানোর বেদনা আছে, কিন্তু ক্ষমতায় থাকার সময়ের আত্মসমালোচনার ছায়াটুকুও নেই!
ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারত কেন সমর্থন করলো, তারেক রহমানকে কেন দেশে ফিরতে দিলো – এসব প্রশ্নের উত্তর চেয়েছেন তিনি। কিন্তু এখানেও যেন এক অদ্ভুত দ্বৈততা। একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বের কথা, অন্যদিকে ভারতের সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ – আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। শেখ হাসিনা নেই দেশে, কিন্তু দলের নেতৃত্বের প্রশ্নে তাঁর সিদ্ধান্তের ছায়া এখনও স্পষ্ট। শেখ রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে আসছেন না। আর তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম দায়িত্ব পালন করবেন – এমন বক্তব্যই এসেছে ঐ সাক্ষাৎকারে।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার নিজের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধারটাই যেন বেশি তীক্ষ্ণ ছিলো। আর সেখানেই এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা। কারণ, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে মানুষ শুধু অভিযোগ শুনতে চায় না – শুনতে চায় আত্মসমালোচনা।
এই সাক্ষাৎকার তাই অনেকের চোখে হতে পারে ক্ষমতা হারানোর পরও ক্ষমতার ভাষা আঁকড়ে থাকার এক প্রতিচ্ছবি। দেশের বাইরে থেকেও দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেষ্টা। অভিযোগ আছে, ক্ষোভ আছে, ভয় আছে, ফেরার আকাঙ্ক্ষা আছে – কিন্তু নেই সেই বহুল প্রত্যাশিত আত্মজিজ্ঞাসা।
ক্ষমতার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে আত্মসমালোচনা। কিন্তু সেখানে যদি থাকে শুধু অতীতের সাফাই, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত – তাহলে সেই সাক্ষাৎকার হয়ে ওঠে, ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে পুরোনো ক্ষমতার প্রতিধ্বনি।
হয়তো শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরতে চান। কিন্তু বাংলাদেশ কি আগের জায়গায় আছে? রাজনীতি কি আগের মতো আছে? আর সবচেয়ে বড় কথা – বাংলাদেশের মানুষ কি আবার সেই পুরোনো রাজনীতির কাছেই ফিরতে চায়? উত্তরটা কোনো মোবাইলফোনের ওপারে নেই। উত্তরটা আছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে, বাংলাদেশের রাজপথ আর ভোটের বাক্সে। একদিনে ক্ষমতা হারানো যায়, কিন্তু ক্ষমতার স্মৃতি মুছতে লাগে অনেক বছর। আর ইতিহাস কাউকেই শুধু নিজের গল্প বলতে দেয় না, একদিন না একদিন, অন্য পক্ষের গল্পটাও শুনিয়ে দেয়।
পড়ুন : ডিপ্রেশন-অভিমান পেরিয়ে আত্মহত্যা: দায় কি শুধু ব্যক্তির?
ভিডিও দেখুন : https://www.youtube.com/watch?v=ovY67pap8ww


