সারাদেশে সার ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে দেশের ৬৪টি জেলাতেই মনিটরিং সেল গঠন করেছে সরকার। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সারের সংকট সংক্রান্ত একটি জরুরি আলোচনায় অংশ নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানিয়েছেন, সাধারণ কৃষকদের সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট কিংবা অনিয়ম রুখতে সরকার ইতোমধ্যেই কার্যকর ও জোরালো একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সারাদেশে ৬৪টি জেলায় মনিটরিং সেল গঠনের মাধ্যমে সারের সার্বিক সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার ওপর কড়া নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ বিধির আওতায় পাবনা-১ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সারের অতি সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য সংকট নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের মাধ্যমে আলোচনার সূত্রপাত করেন। উক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সারের বর্তমান পরিস্থিতি, সামগ্রিক মজুত এবং সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থার বিভিন্ন কাঠামোগত দিক বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত প্রতিটি জেলা মনিটরিং সেল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করছে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সার সংক্রান্ত কোনো অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া মাত্রই উক্ত মনিটরিং সেলগুলো অবিলম্বে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
কৃষি খাতে সারের চাহিদার হিসেব ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে সারের মোট চাহিদা রয়েছে ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরকারের হাতে সার্বিক সারের মজুত রয়েছে ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ফলে গাণিতিক হিসেবে দেখা যায় যে, বর্তমানে দেশে চাহিদার অতিরিক্ত প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন সার উদ্বৃত্ত হিসেবে গচ্ছিত রয়েছে। ফলে কোনো অবস্থাতেই দেশে সারের ঘাটতি হওয়ার সুযোগ নেই। সারের সঠিক বিতরণ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে প্রতিটি মনিটরিং সেলের দায়িত্বে দুজন করে যুগ্মসচিব ও উপ-সচিব পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োজিত করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সারাদেশের ৬৪টি জেলায় সার বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
সংবাদ আলোচনায় সার ডিলার নিয়োগ ও বর্তমান শূন্যতা নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিচারে নিয়োগ পাওয়া বিপুলসংখ্যক ডিলার এতদিন সার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তাঁদের মধ্য থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯ জন ডিলার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন কিংবা দায়িত্ব থেকে আত্মগোপন করেছেন। বিপুল সংখ্যক ডিলার পালিয়ে যাওয়ার কারণে সারা দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ে ডিলারশিপের বড় ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা সার বিতরণে সাময়িক স্থবিরতা তৈরি করেছিল।
এই শূন্যতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সরকারের গৃহীত নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে শূন্য পদগুলো পূরণে সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগের সার্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নতুনভাবে নির্ধারিত এসব প্রধান ডিলারদের প্রত্যেকে আবার স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়নভিত্তিক কাজ আরও গতিশীল করতে অতিরিক্ত দুজন করে নতুন ডিলার নিয়োগ করার সুযোগ পাবেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সকল ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত সার ব্যবস্থাপনা আরও সুসংগঠিত হবে এবং স্থানীয় কৃষকদের দুয়ারে সুষম সার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ সহজতর হয়ে উঠবে।
মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সার সংকটের যেসব গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে, সেটির কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে আমন ধান পাকা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে এ মুহূর্তে আমন চাষিদের মধ্যে সারের তেমন ব্যাপক বা জরুরি চাহিদা নেই। তবে সাধারণ কৃষকরা আসন্ন বোরো মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে আগেভাগেই সার কিনে নিজেদের ঘরে মজুত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে বোরো চাষের আগাম প্রস্তুতির কারণে স্থানীয় বাজারে নন-ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত চাহিদা ও এক ধরনের কৃত্রিম চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি আরও জানান, সরকার এ পর্যন্ত নতুন ডিলারদের চূড়ান্ত নিয়োগ দেয়নি। কারণ ডিলার নিয়োগ পাওয়ার জন্য আগ্রহীদের আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময়সীমা ছিল ১০ সেপ্টেম্বর। আবেদনপত্র বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অতি দ্রুত যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
একই আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে সারের সার্বিক মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে দেশে বিভিন্ন প্রকার সারের পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক মজুত বহাল রয়েছে। সারের মজুতের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ইউরিয়া সারের মজুত রয়েছে ৪ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন, ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি সারের মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি সারের মজুত রয়েছে ৩ লাখ ২ হাজার মেট্রিক টন এবং মিউরিয়েট অব পটাশ বা এমওপি সারের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন।
আমদানিকৃত ও গুদামজাত সারের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ সার দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছানোর পথে রয়েছে বলে জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে পরিবহনের সুবিধার্থে বিভিন্ন রুটে ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০ মেট্রিক টন টিএসপি, ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন এমওপি সার দেশের জেলা পর্যায়ে সরবরাহের জন্য পরিবহনধীন রয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান বাজার কাঠামো উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমানে সারাদেশে ১ হাজার ১০৫ জন মূল ডিলার এবং ৩১ হাজার ৬০০ জন খুচরা ডিলার সক্রিয় রয়েছেন। সার বিতরণ ব্যবস্থাকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে আরও দ্রুত ও মসৃণ করতে সরকার আরও ৮ হাজার ৬৮৭ জন নতুন মূল ডিলার এবং ১৬ হাজার অতিরিক্ত খুচরা ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়ন ঘটলে দেশের প্রান্তিক কোনো কৃষককেই সার নিয়ে আর কোনো প্রকার দুর্ভোগ বা সংকটের মুখে পড়তে হবে না।
সূত্র-বাসস
পড়ুন : ডব্লিউএইচওর পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ
সা/


