দিন যত যাচ্ছে আত্মহত্যার প্রবণতা তত বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা ফের উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে মারা গেছেন। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০ জন। তবে ২০২২ ও ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৫৩২ ও ৫১৩ জন।
২০২৫ সালের মোট আত্মহত্যার ঘটনায় ১৯০ জন ছিলেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া শিক্ষার্থী, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ২৮ শতাংশ ঘটনা বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ২৩ শতাংশ আত্মহত্যার পেছনে ছিল ক্ষোভ বা মানসিক অভিমান। এ ছাড়া প্রেমের সম্পর্ক ১৩ শতাংশ, পারিবারিক কলহ ৮ শতাংশ, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ৬ শতাংশ এবং যৌন সহিংসতা ৩ শতাংশের বেশি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণেও মানসিক চাপের ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ছাত্রীদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশের সঙ্গে বিষণ্নতা এবং ৩২ শতাংশের সঙ্গে মানসিক কষ্টের সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে, ছাত্রদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনায় বিষণ্নতা এবং ৩৮ শতাংশ ঘটনায় মানসিক কষ্টকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সাইদ বলেন, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। বিভিন্ন সমস্যা, চাপ ও সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে একজন মানুষ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। কেউ আত্মহত্যার কথা বললেও সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিভাগভেদে ঢাকায় সর্বোচ্চ
২০২৫ সালে আঁচল ফাউন্ডেশনের আরেকটি জরিপে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বিভাগভিত্তিক পার্থক্যও উঠে এসেছে। এতে ঢাকা বিভাগে আত্মহত্যার হার ছিল সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশ। এরপর খুলনা বিভাগে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
রাজশাহী ও বরিশাল—দুই বিভাগেই এ হার ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া রংপুরে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সিলেটে ২ দশমিক ৯ শতাংশ আত্মহত্যার হার রেকর্ড করা হয়েছে।
পুরুষের আত্মহত্যা বেশি, চেষ্টায় এগিয়ে নারী
লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পুরুষদের হার নারীদের তুলনায় বেশি। প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৩ দশমিক ৬ জন। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার প্রতি ১ লাখে ২ জন।
তবে আত্মহত্যার চেষ্টার ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র দেখা যায়। নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টার হার প্রায় ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপ
আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সংকটকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু গবেষণার অনুমান অনুযায়ী, বাংলাদেশে পুরুষ ও নারী উভয়ের আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যার চেষ্টার ৫৫ থেকে ৮১ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় বাংলাদেশের পুরুষদের আত্মহত্যার পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার বিষয়টিও উঠে এসেছে। পরিবারের আর্থিক জোগানদাতা হিসেবে সাংস্কৃতিকভাবে প্রত্যাশিত ভূমিকা পূরণে ব্যর্থতার চাপ থেকে মানসিক কষ্ট ও পারিবারিক কলহ তৈরি হতে পারে। একইভাবে বৈবাহিক প্রত্যাশা ও সম্পর্কের চাপও পুরুষদের মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে। এর মধ্যে বিয়ের পর সামাজিকভাবে নির্ধারিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক চাপের বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে। তরুণ বিবাহিত নারী, নিম্ন আর্থ-সামাজিক পটভূমির মানুষ এবং গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটে বলে জানা গেছে।
নারীদের আত্মঘাতী আচরণের পেছনে গবেষকরা লিঙ্গ বৈষম্য, কম শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাল্যবিয়ে বা জোরপূর্বক বিয়ে, পারিবারিক কলহ, বন্ধ্যাত্ব, সন্তান ধারণের চাপ, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে বিরোধ, ধর্ষণের কারণে গর্ভধারণ এবং অন্যান্য সামাজিক নিপীড়ন ও নির্যাতনকে সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আত্মহত্যায় প্রচলিত পদ্ধতি
বাংলাদেশে আত্মহত্যার সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি হিসেবে গলায় ফাঁস দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রশির মতো ফাঁস দেওয়ার উপাদান ছাড়া এ পদ্ধতিতে কোনো খরচ হয় না এবং এ কারণেই এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষ পানও বাংলাদেশে আত্মহত্যার একটি প্রচলিত পদ্ধতি। শহরাঞ্চলে বারবিটুরেট ট্যাবলেটের অতিরিক্ত মাত্রা গ্রহণসহ অন্যান্য পদ্ধতিও অনুসরণ করা হয়। এ ছাড়া গায়ে আগুন দেওয়া, ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেওয়া এবং ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার ঘটনাও রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ পরিকল্পনার উদ্যোগ
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বাংলাদেশ ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের একটি বহু খাতভিত্তিক জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ জোরদার করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য আইন-২০১৮, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০২২ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০৩০-এর ভিত্তিতে পরিকল্পনাটি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না; প্রয়োজন সামাজিক ও নীতিগত পরিবর্তনও। সংকটে থাকা মানুষের কথা বিচার না করে শোনা, দ্রুত সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার মাধ্যমে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব।


