মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল বাজারে পৌঁছানোর বিকল্প পথ চালু হওয়ার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের এই ধারা টানা তৃতীয় কার্যদিবসে গড়িয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ০১ ডলার বা ১ শতাংশ কমে ১০৩ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ফিউচারসের দাম ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ০৩ ডলার বা ১ শতাংশ কমে ১০০ দশমিক ৮৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবারের শেষ লেনদেনেও উভয় জ্বালানি সূচকেই প্রায় ১ শতাংশ করে দরপতন দেখা গিয়েছিল। তবে এই দরপতনের পরও তেলের দাম এখনও ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথিদের মধ্যে বৃহস্পতিবার নতুন করে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা এবং সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও বাজারের ব্যবসায়ীরা নতুন এই সরবরাহ ঝুঁকিকে খুব একটা প্রাধান্য দেননি।
দেশে জ্বালানি আমদানির শর্ত শিথিল করেছে সরকার
সরকার সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে সরকারি-টু-সরকারি (জিটুজি) চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিদ্যমান ৫০:৫০ অনুপাত শিথিল করেছে। এর ফলে বিদেশি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরাসরি আরও বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল কিনতে পারবে বাংলাদেশ।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আগামী চার মাসে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদে জিটুজি সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের ৫০:৫০ অনুপাত শিথিল করার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রস্তাবটি কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়।
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইউনিপেক (Unipec) ও পেট্রোচায়না (PetroChina) এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি (BSP) থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করবে বাংলাদেশ। প্রচলিত রেফারেন্স মূল্য, দরকষাকষির মাধ্যমে নির্ধারিত প্রিমিয়াম ও নির্ধারিত পরিমাণের ভিত্তিতে এসব জ্বালানি সংগ্রহ করা হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হলো। এর আগে গত সপ্তাহে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহের পাঁচটি পৃথক প্রস্তাব বা প্যাকেজ কমিটি বাতিল করেছিল। উচ্চ দামের কারণেই ওই প্রস্তাবগুলো নাকচ করা হয়।
ওই পাঁচ প্যাকেজে প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার থেকে ৭ লাখ ৫ হাজার টন ডিজেল, প্রায় ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন ফার্নেস অয়েল রাখার প্রস্তাব ছিল। প্রস্তাবিত সরবরাহকারীদের তালিকায় ছিল ট্রাফিগুরা (Trafigura), ভিটোল এশিয়া (Vitol Asia) এবং ইউনিপেক সিঙ্গাপুর (Unipec Singapore)।
প্যাকেজগুলোর সম্মিলিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংগ্রহে যে ব্যয় হয়েছে, তার তুলনায় এই মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল। পরে প্রস্তাবগুলো আবার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের আগে সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রিমিয়াম ও রিফাইনারি মূল্য আরও কমিয়ে আনার নির্দেশ দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে।
পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম। জিটুজি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সরবরাহকারীর কাছ থেকে ডিজেলসহ অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক আমদানিতে চীন, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ও ওমানের সরবরাহকারীরা যুক্ত ছিল।
অন্যদিকে, অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্ভরতা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর কেন্দ্রীভূত।
তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকায় এর সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এতে বাংলাদেশে আমদানি করা পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন মেয়াদেও জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একই ধরনের শিথিলতা আনা হয়েছিল। সে সময় কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্রায়ত্ত সরবরাহকারীর কাছ থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহের অনুমোদন দেয় সরকার।
পড়ুন : আগস্টে মূল্যস্ফীতি ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন
সা/


