দেশের ব্যাংক খাতে নিয়মনীতি, নৈতিকতা ও সুশাসনের গুরুতর অবক্ষয়ের কারণে ভয়াবহ ‘ব্ল্যাকহোল’ বা কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনি মারপ্যাঁচ এবং বেনামি ঋণের প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে ‘ব্যাংক ব্যবস্থায় নৈতিকতা’ শীর্ষক ২৩তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতায় এসব কথা বলেন অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে ৩২ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ আমানতকারীদের কষ্টার্জিত টাকার প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকা ঋণ হিসেবে আটকে আছে। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংক খাতের মূল চালিকাশক্তি তহবিলের ঘূর্ণায়মান চক্র ভেঙে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ব্যাংকের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জোরপূর্বক একীভূতকরণ কিংবা দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুধু ব্যাংক খাত নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। একদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে সক্ষম ব্যাংকগুলোও ঝুঁকি এড়াতে নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে যোগ্য উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যকর মূলধন ও নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছে না। এতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ আরও বলেন, ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। এর ফলে সরকার ব্যাংক খাত থেকে তুলনামূলক সহজে ঋণ পাচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির খবর আমানতকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি করছে। অনেক আমানতকারী ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়ায় তারল্য চাপও বাড়ছে। তাই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ কমানো এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
খেলাপি ঋণ আদায়ে বন্ধকি সম্পত্তির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর মোট ১৭ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৬৩ দশমিক ৩১ শতাংশ ঋণের বিপরীতে স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে প্রভাবশালী ও বড় ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি কিনতে আগ্রহী ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
তাঁর মতে, বর্তমানে ৫০০ কোটি বা এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি কিনতে আগ্রহী পর্যাপ্ত ক্রেতা নেই। সম্প্রতি ভোগ্যপণ্য খাতের একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ৪০০ কোটি টাকায় বিক্রির জন্য একজন ক্রেতা পেলেও এর মধ্যে ১০০ কোটি টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে এবং বাকি ৩০০ কোটি টাকা নগদে পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন, গত দুই দশকে দেশের কিছু এলাকায় সম্পত্তির দাম ১০ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মৌজা রেট বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়নি। ফলে রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কমানোর জন্য অনেকেই মৌজা দরে সম্পত্তি নিবন্ধন করতে আগ্রহী হন। এতে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ এবং তা বিক্রি করে খেলাপি ঋণ উদ্ধারে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এই সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাজারমূল্য ও মৌজা রেটের মধ্যে পার্থক্য কমানোর পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে কালো টাকার মালিকদের খেলাপি ঋণ উদ্ধারে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে সমস্যার আংশিক সমাধান করা যেতে পারে বলেও মত দেন। তবে এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে এককালীন কর নেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন, ওই ঘটনা প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের দুর্বল করলেও তাঁদের পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি। এসব ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে তাঁদের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির সংকলিত তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, দেশের ব্যাংকগুলোতে ২৪টি বড় জালিয়াতির ঘটনায় মোট ৯২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এসব ঘটনায় হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যাননটেক্স ও রিজেন্ট হসপিটালের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ এককভাবে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়েছে, যার একটি বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রা ও ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দেন অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্। তাঁর মতে, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর।
পড়ুন:নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি, যেভাবে বাস্তবায়ন হবে
ইমি/


