কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করার দাবি করেছে জেলা পুলিশ। আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হলেও, এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জোর তদন্ত চালানো হচ্ছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) সহ অন্য আসামিদের বয়সের বেশ ফারাক ছিল। আসামি তুহিন কুমিল্লা সিটি কলেজ থেকে ড্রপআউট, আর বাকিদের মধ্যে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও কামরুল ময়নামতি কারিগরি স্কুলের নবম শ্রেণি এবং সিয়াম আব্দুল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। বয়সে বড় ও বখাটে স্বভাবের এসব তরুণের সঙ্গে অপ্রতিমের একধরনের ‘অসম বন্ধুত্ব’ গড়ে উঠেছিল।
পুলিশ সুপার জানান, প্রধান আসামি তুহিনের বাড়ি থেকে নিহত অপ্রতিমের উদ্ধারকৃত আইফোনটি জব্দ করা হয়েছে। তবে কেবল দামি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, নাকি এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টিকটক বা অন্য কোনো দ্বন্দ্ব ছিল-তা নিশ্চিত হতে তদন্ত অব্যাহত রাখা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা ছিল না বলেও জানান তিনি।
বিচার প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হবে। রামিসা হত্যার মামলায় যেমন দ্রুত রায় এসেছে, এই মামলাটির জন্যও দ্রুত আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে আবেদন রাখবো।
নিহত অপ্রতিম ও আসামি তুহিনের বয়স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, তার (অপ্রতিম) বয়স ১৩, আর আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন, তার বয়স ১৯। সে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ফেল করে ২০২৫ সালে ড্রপআউট হয়।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছি, মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি এবং যে আইফোনটির কারণে হত্যাকাণ্ড, সেই আইফোনটিও আমরা আসামির দেখানো মতে তার বাসা থেকে উদ্ধার করেছি। আমরা বাকি তদন্ত কাজ শেষ করে দ্রুত বিজ্ঞ আদালতে এই মামলার পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করবো।
এর আগে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, রামিসা হত্যার বিচারের মতো অপ্রতিম হত্যার বিচার দ্রুত করতে পারবো। বিচার করবে আদালত, আমরা সব সহযোগিতা করবো।
তুহিনের বিরুদ্ধে বাইক চুরির অভিযোগ
অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক তুহিনের বিরুদ্ধে বাইক চুরির অভিযোগ করেছেন আসাদুল্লা সোহাগ (২১) নামের এক তরুণ।
শনিবার তুহিনের আটকের খবর পাওয়ার পর নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দেন সোহাগ। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, তাকেও একইভাবে ডেকে নিয়ে তার বাইক নিয়ে গিয়েছিল তুহিন। এ ঘটনায় পুলিশের কাছে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে আসাদুল্লাহ সোহাগ উল্লেখ করেন, চোর তুহিন থেকে আজকে সে খুনি তুহিন! সে আমাকেও একইভাবে ডেকে এনে কৌশলে আমার বাইকটি নিয়ে যায়। ওর বিরুদ্ধে যখন আমি মামলা করতে গিয়েছিলাম, তখন সদর দক্ষিণ থানার পুলিশ আমার মামলা না নিয়ে শুধু একটা জিডি নিয়েছিল। কিন্তু ওর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমাদের বলেছিল—ওর মাথার ওপর নাকি কোনো এক রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত আছে, তাই ওকে যেন কিছু না করা হয়! আমি সেদিন চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলব—দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র নয়! টাকা ছাড়া এই দেশে কোনো কিছুর বিচার পাওয়া যায় না। আমার বাইক চুরি গেছে, সেটা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। কিন্তু আমি মনে করি, ছোট অপরাধ পার পেয়ে গেলেই অপরাধীরা পরবর্তীতে বড় অপরাধ করার সাহস পায়। সেদিন যেই নেতার পাওয়ার দেখিয়ে ওকে আইন থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজ ওকে কীভাবে বাঁচাবেন?
পোস্টের সঙ্গে একটি অভিযোগপত্রের ছবি, চুরি যাওয়া বাইকের ছবি, তুহিনের ছবি এবং একটি ফটোকার্ড সংযুক্ত করেন তিনি।
এদিকে তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধারের কথা জেলা পুলিশের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার বিষয়ে রোববার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে জেলা পুলিশ। আইফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তুহিন ও আনাস ছাড়াও ফাহিম নামে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শনিবার রাত পৌনে ১২টা পর্যন্ত প্রশাসনের কেউ ফাহিমের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
নিখোঁজের পর ঝোপ থেকে উদ্ধার মরদেহ
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর আর বাসায় ফেরেনি সে। পরে তার বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন।
নিখোঁজের পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের ঝোপ থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এ ঘটনায় তুহিন নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। পরে বিকেলে আনাস নামের আরও একজনকে এসআরবি আটক করেছে বলে জানা গেছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
‘আমার তো একটাই ছেলে, ওকে ছাড়া জীবন পার করব কীভাবে’
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আহাজারি করতে গিয়ে তার মা ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে আমি জানতে চাই, আমাকে জবাব দেন। আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটাই কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি শুধু সেটার জবাব চাই।’
শনিবার দুপুরে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকায় ড. নাহিদা বেগমের বাসায় যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তার কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলেন নাহিদা বেগম।
তিনি বলেন, এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে? আমার তো একটাই ছেলে। কীভাবে আমার জীবন কাটাব? আপনারা সবাই বলেন, ওকে ছাড়া আমি আমার জীবন পার করব কীভাবে?
এ সময় ড. নাহিদা বেগমের কান্না দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনিও কেঁদে ওঠেন। পরে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেন তিনি।
পড়ুন : অপ্রতিম হত্যা: আটক তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধার সেই আইফোন


