সিগারেট, ওষুধ, মোবাইল ফোন ও ব্যাংকিংসহ ১১ খাতে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) এনবিআরের ভ্যাট অনুবিভাগ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে।
অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন বাধ্যতামূলক হওয়া খাতগুলো হচ্ছে- সিগারেট, মোবাইল ফোন, এমএস পণ্য, ওষুধ, পানীয়, সিমেন্ট, টাইলস, রং ও বার্নিশ, বীমা, ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী খাত এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী খাত।
এ বিষয়ে এনবিআরের আদেশে বলা হয়, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ৬৪ এর উপধারা (৫) এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬ এর বিধি ১১৮(ক) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বর্ণিত খাতগুলোর ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদনকারীদের এবং বর্ণিত সেবা খাতগুলোর ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) eVAT পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে দাখিলপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা হলো। যদি কোনো নিবন্ধিত ব্যক্তি উপরোল্লিখিত পণ্য বা সেবার পাশাপাশি অন্য কোনো পণ্য বা সেবা সরবরাহ কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত থাকেন, তবে তার ক্ষেত্রেও এই আদেশ প্রযোজ্য হবে।
আদেশে আরও বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনলাইনে দাখিলপত্র পেশ বাধ্যতামূলক-সংক্রান্ত ইতোপূর্বে কোনো আদেশ জারি করে থাকলে, এই আদেশ জারির পর ওই আদেশগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই আদেশে বর্ণিত খাতগুলোর তালিকায় যেকোনো সময় সংযোজন বা বিয়োজনের ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
ভ্যাট রিটার্ন কী?
ভ্যাট রিটার্ন হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কেনাবেচা, সংগৃহীত ভ্যাট ও পরিশোধিত ভ্যাটের হিসাব দিয়ে কর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবরণী। ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (VAT)-নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত এই হিসাব দাখিল করতে হয়। এর মাধ্যমে সরকার বুঝতে পারে ব্যবসাটি সঠিকভাবে কর সংগ্রহ ও জমা দিচ্ছে কি না।
মূল উপাদান সমূহ
আউটপুট ভ্যাট: পণ্য বা সেবা বিক্রির সময় ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া ভ্যাট।
ইনপুট ভ্যাট: কাঁচামাল বা পণ্য কেনার সময় সরবরাহকারীকে দেওয়া ভ্যাট।
নিট ভ্যাট: সংগৃহীত ভ্যাট থেকে পরিশোধিত ভ্যাট বাদ দেওয়ার পর সরকারের পাওনা বা ব্যবসায়ীর পাওনা হিসাব।
দাখিলের নিয়ম ও প্রক্রিয়া
ফরম: বাংলাদেশে সাধারণত মূসক-৯.১ (Mushak 9.1) ফর্মে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হয়।
সময়: সাধারণত প্রতি মাসের পরবর্তী নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে এটি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
মাধ্যম: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই ঘরে বসে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা
অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন (মূসক-৯.১) সাবমিট করার আগে নিচের হিসাব ও কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখতে হয়:
বিক্রয় হিসাব পুস্তক (মূসক-৬.১): চলতি কর মেয়াদে মোট কত টাকার পণ্য বা সেবা বিক্রি করা হয়েছে তার বিবরণী।
ক্রয় হিসাব পুস্তক (মূসক-৬.২): চলতি কর মেয়াদে মোট কত টাকার কাঁচামাল বা বাণিজ্যিক পণ্য কেনা হয়েছে তার বিবরণী।
ট্রেজারি চালান বা ই-পেমেন্ট রসিদ: যদি কোনো ভ্যাট ব্যাংকে বা অনলাইনে জমা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার প্রমাণ বা চালান নম্বর।
উৎস কর্তন কর সনদ (VDS Certificate – মূসক-৬.৬): কোনো ক্রেতা যদি আপনার বিল থেকে আগেই ভ্যাট কেটে রেখে থাকে, তবে সেই সার্টিফিকেট।
আমদানি সংক্রান্ত দলিল (Commercial Invoice & Bill of Entry): পণ্য আমদানি করে থাকলে কাস্টমসের প্রয়োজনীয় তথ্য।
অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে এনবিআর (NBR) ই-ভ্যাট পোর্টাল-এর মাধ্যমে ঘরে বসেই রিটার্ন দাখিল করা যায়। প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:
পোর্টালে লগইন: প্রথমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভ্যাট অনলাইন পোর্টাল-এ গিয়ে আপনার ইউজার আইডি (User ID) এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।
ফরম নির্বাচন: ড্যাশবোর্ড থেকে ‘Filing’ অপশনে যান এবং ‘Mushak 9.1’ (মূসক-৯.১) রিটার্ন ফরমটি সিলেক্ট করুন।
কর মেয়াদ নির্ধারণ: আপনি যে মাসের ভ্যাট রিটার্ন দিচ্ছেন, সেই কর মেয়াদ (Tax Period) নির্বাচন করুন।
তথ্য পূরণ: বিক্রয় হিসাবের তথ্য (Part-3) এবং ক্রয় হিসাবের তথ্য (Part-4) সাবধানে ইনপুট দিন। কোনো রেয়াত (Input Tax Credit) বা উৎসে কর্তন (VDS) থাকলে নির্দিষ্ট কলামে তা যোগ করুন।
চলতি হিসাব সমন্বয় (Part-7): যদি কোনো ভ্যাট করদাতার চলতি হিসাবের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়, তবে ট্রেজারি চালানের তথ্য এখানে এন্ট্রি করুন।
যাচাই ও দাখিল (Submission): সব তথ্য পূরণ শেষে ‘Check’ বাটনে ক্লিক করে কোনো ভুল আছে কিনা দেখে নিন। সব ঠিক থাকলে ‘Submit’ বাটনে ক্লিক করুন।
রসিদ সংগ্রহ: রিটার্ন সফলভাবে জমা হওয়ার পর একটি Ackowledgement Receipt বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পাবেন। এটি ডাউনলোড করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করুন।
ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ (Deadline) প্রতি মাসের ১৫ তারিখ: প্রত্যেক করদাতার জন্য কর মেয়াদ (Tax Period) শেষ হওয়ার পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক. যেমন: সেপ্টেম্বর মাসের ব্যবসার ভ্যাট রিটার্ন অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হবে।
ছুটির দিনের নিয়ম: যদি কোনো মাসের ১৫ তারিখ সরকারি ছুটির দিন (যেমন: শুক্রবার বা শনিবার) হয়, তবে তার পূর্ববর্তী শেষ কার্যদিবসে রিটার্ন জমা দিতে হয়।
বিশেষ ক্ষেত্রে সময় বৃদ্ধি: সার্ভার জটিলতা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) মাঝেমধ্যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই সময়সীমা ২-৩ দিন বা তার বেশি বাড়িয়ে থাকে।
রিটার্ন জমা না দিলে বা দেরিতে দিলে জরিমানা ও সুদ
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী আর্থিক ক্ষতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়:
আর্থিক জরিমানা: সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২,০০০ (দুই হাজার) টাকা বিলম্ব ফি বা জরিমানা (Late Penalty) আরোপিত হয়।
মাসিক সুদ (Interest): রিটার্নের সাথে বকেয়া ভ্যাট থাকলে, নির্ধারিত তারিখ পার হওয়ার পর থেকে প্রতিদিনের জন্য বকেয়া করের ওপর বার্ষিক ২৪% হারে (মাসিক ২%) সরল সুদ যুক্ত হতে থাকে।
ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট বা রেয়াত বাতিল: সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে ওই মাসের কোনো ক্রয়ের বিপরীতে ইনপুট ভ্যাট রেয়াত (Input Tax Credit) দাবি করা যায় না।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থগিত বা লক: পরপর কয়েক মাস রিটার্ন দাখিল না করলে ভ্যাট অনলাইন পোর্টাল থেকে আপনার BIN (Business Identification Number) সাময়িকভাবে লক বা স্থগিত করে দেওয়া হতে পারে, যার ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বা কোনো টেন্ডারে অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না।
পড়ুন : ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি


