আইফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ‘সিরি’র সক্ষমতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের ২৫ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। তবে এটি আদালতে চলমান একটি শ্রেণি-ভিত্তিক মামলা নিষ্পত্তির জন্য করা সমঝোতা; অ্যাপল কোনো অনিয়ম বা আইন ভঙ্গের অভিযোগ স্বীকার করেনি।
২০২৪ সালে আইফোন ১৬ সিরিজ উন্মোচনের সময় অ্যাপল ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’-এর আওতায় সিরির বেশ কিছু নতুন সক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল। এর মধ্যে ছিল ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রসঙ্গ বুঝে উত্তর দেওয়া, স্ক্রিনে থাকা তথ্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং বিভিন্ন অ্যাপের ভেতরে আরও গভীরভাবে কাজ করার সক্ষমতা। মামলার বাদীপক্ষের অভিযোগ, এসব ফিচারকে বিজ্ঞাপনে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যাতে ক্রেতাদের মধ্যে এগুলো দ্রুতই আইফোনে পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, নির্দিষ্ট কিছু এআই ফিচার আইফোন কেনার সময় বা তার পরপরই পাওয়া যায়নি। ফলে গ্রাহকেরা বিজ্ঞাপনে প্রদর্শিত সক্ষমতার প্রত্যাশা নিয়ে ডিভাইস কিনলেও বাস্তবে সেই অভিজ্ঞতা পাননি বলে মামলায় দাবি করা হয়। পরবর্তীতে অ্যাপল এসব ফিচারের কিছু অংশের প্রকাশ পিছিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অ্যাপল নতুন প্রজন্মের এআই-চালিত সিরি উন্মুক্ত করার কথা জানায়, যেখানে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বোঝা, অন-স্ক্রিন সচেতনতা এবং অ্যাপের মধ্যে বিভিন্ন কাজ করার সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেনা কিছু আইফোনের মূল ক্রেতারা দাবি করতে পারবেন। ২০২৪ সালের ১০ জুন থেকে ২০২৫ সালের ২৯ মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কেনা আইফোন ১৫ প্রো, আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স এবং আইফোন ১৬ সিরিজের বিভিন্ন মডেল এই তালিকায় রয়েছে। সরকারি settlement notice অনুযায়ী, আইফোন ১৬, ১৬ই, ১৬ প্লাস, ১৬ প্রো, ১৬ প্রো ম্যাক্স, ১৫ প্রো এবং ১৫ প্রো ম্যাক্স মডেলগুলো যোগ্য ডিভাইসের মধ্যে রয়েছে।
যোগ্যতার ক্ষেত্রে শুধু ফোনটির মালিক হওয়াই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ডিভাইসটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কেনা হতে হবে এবং ক্রেতাকে সেটি পুনর্বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কেনা হয়নি—এমন শর্তও রয়েছে। settlement website-এর তথ্য অনুযায়ী, দাবি করার সময় ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে ডিভাইসটি যাচাই করতে হতে পারে।
সমঝোতা অনুযায়ী, বৈধভাবে আবেদন করা প্রতিটি যোগ্য ডিভাইসের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৫ ডলার করে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে মোট কতজন বৈধ দাবি করবেন, তার ওপর চূড়ান্ত অর্থের পরিমাণ নির্ভর করবে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ডিভাইসে সর্বোচ্চ ৯৫ ডলার পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ ২৫ ডলারকে নিশ্চিত চূড়ান্ত অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না; সব দাবি যাচাই ও হিসাব শেষ হওয়ার পর প্রকৃত অর্থ নির্ধারিত হবে।
২৫ কোটি ডলারের settlement fund থেকে শুধু গ্রাহকদের অর্থই দেওয়া হবে না। আদালত অনুমোদিত আইনজীবী ফি, প্রশাসনিক ব্যয়, নোটিশ ও অন্যান্য নির্ধারিত খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ যোগ্য দাবিদারদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। ফলে প্রত্যেক গ্রাহকের চূড়ান্ত প্রাপ্ত অর্থ দাবির সংখ্যা ও অনুমোদিত অন্যান্য খরচের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে এবং ২১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। যোগ্য গ্রাহকদের settlement-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে Claim Form পূরণ করতে হবে।
আবেদন করার সময় ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি যোগ্য আইফোনের সিরিয়াল নম্বরসহ ক্রয় যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হতে পারে। যেসব গ্রাহক settlement-এর নোটিশ পেয়েছেন, তাদের ই-মেইল বা পোস্টকার্ডে Claim ID ও PIN দেওয়া থাকতে পারে। তবে এসব তথ্য না থাকলেও অফিসিয়াল সাইটে বিকল্পভাবে দাবি জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে settlement কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
অন্যদিকে, কেউ যদি settlement-এর অংশ হতে না চান এবং ভবিষ্যতে একই অভিযোগের ভিত্তিতে অ্যাপলের বিরুদ্ধে নিজের আলাদা আইনি দাবি করার অধিকার রাখতে চান, তাহলে ২১ ডিসেম্বরের মধ্যে settlement থেকে নিজেকে বাদ দেওয়ার বা opt out করার সুযোগ রয়েছে। তবে opt out করলে settlement থেকে কোনো অর্থ পাওয়া যাবে না।
ক্ষতিপূরণের আবেদন শুরু হলেও গ্রাহকদের অর্থ প্রদান এখনই শুরু হচ্ছে না। settlement-এর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই শুনানিতে আদালত প্রস্তাবিত নিষ্পত্তিটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পর্যাপ্ত কি না, তা বিবেচনা করবে।
Settlement-এর অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, আদালতের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে গ্রাহকদের কাছে অর্থ বিতরণ সম্পন্ন হবে না। তাই এখন আবেদন করলেও টাকা পাওয়ার সময় নির্ভর করবে আদালতের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর।
এদিকে অ্যাপল মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের ভুল বা বেআইনি কর্মকাণ্ড স্বীকার না করেই মামলার খরচ, ঝুঁকি ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে সমঝোতায় যেতে সম্মত হয়েছে। ফলে ২৫ কোটি ডলারের এই অর্থপ্রদানকে আদালতের রায়ে অ্যাপলের বিরুদ্ধে অপরাধ বা দায় প্রমাণিত হয়েছে—এমনভাবে দেখার সুযোগ নেই।
পড়ুন:এআই যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
ইমি/


